কোরআনের তাফসীর করতে কি জানতে হয়

shutterstock_58382248

(১) অভিধানিক অর্থ জানা থাকা জরুরী। এর দ্বারা প্রতিটি শব্দের মূল ধাতুগত অর্থ জানা যাবে। হযরত মুজাহিদ (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক ও পরকালকে বিশ্বাস করে তার জন্য সকল আরবী শব্দের অভিধানিক অর্থ জানা ছাড়া কোরআনের ব্যাখ্যা ও এর তাফসীর করা কিছুতেই জায়েয নয়। মাত্র কয়েকটি শব্দার্থ জানাও এর জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ অনেক সময় একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়। আর হয়তো বা সে মাত্র একটি অর্থ জানে অথচ শব্দটি অন্য অর্থে ব্যবহৃর হয়েছে তার জানা অর্থে ব্যবহৃর হয় নি।

(২) আরবী গ্রামার জানা থাকা জরুরী। অর্থাৎ আরবী ব্যাকরণশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হওয়া জরুরী। কারণ জের জবর ও পেশের পরিবর্তনে বাক্যের অর্থও পরিবর্তন হয়ে যায়। আর তা জানা আরবী ব্যাকরণের উপর নির্ভর করে। যেমন কেউ মুজাহিদগণের সম্মান বাড়ানোর জন্য এ আয়াতের অর্থ করল যে, وكفى الله المؤمنين القتال আল্লাহকে পাওয়ার জন্য শুধুমাত্র যুদ্ধ করাই মু'মিনের জন্য যথেষ্ট হবে।

(৩) আরবী শব্দ প্রণালী বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া। কারণ গঠনপ্রণালীর ভিন্নতার কারণে অর্থের মধ্যেও পরিবর্তন এসে যায়। ইবনে ফারেস বলেন, যে ব্যক্তি ইল্‌মে সরফ শিখে নি সে অনেক কিছু হারিয়েছে। আল্লামা যমখশারী (রহ.) তাঁর তাফসীর "আযূবাতে'আসরী" নামক কিতাবে লিখেছেন, কোরআন পাকের আয়াত, يوم ندعو كل أناس بإمامهم অর্থঃ "যেদিন আমি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নেতার সাথে উপস্থিত করব"।  

ইল্‌মে সরফ জানে না এমন এক ব্যক্তি এই আয়াতের অর্থ করল, যেদিন আমি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার মায়ের সাথে ডাকব। আয়াতে (إمام) ইমাম শব্দ এক বচন, কিন্তু ইলমে সরফ না জানার দরুন সে এটাকে (أم) উম্মুন শব্দের বহুবচন মনে করে মাতার অর্থে ব্যবহার করেছে। (উম্মুন অর্থ মাতা) অথচ ইলমে সরফের জ্ঞান থাকলে সে জানত (أم) উম্মুন এর বহুবচন (إمام) ইমাম ব্যবহৃত হয় না।

(৪) ইল্‌মে এশতেক্বাক্ব জানা জরুরী। অর্থাৎ শব্দের ধাতুগত প্রভাব জানতে হবে। কেননা ভিন্ন ভিন্ন ধাতুর কারণে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন (مسيح) শব্দটি (مسح) ধাতু হতে বের হলে অর্থ হবে স্পর্শকারী ও কোন জিনিসের উপরে ভিজা হাত মর্দনকারী, আর (مساحت) ধাতু হতে নির্গত হলে অর্থ হবে কোন জিনিস মাপা ও এর পরিমাণ নির্ণয় করা।

(৫) ইলমে মায়ানী জানা থাকা জরুরী। যা দ্বারা বাক্যের অর্থের জোড় মিলসমূহ জানা যায়।

(৬) ইলমে বয়ান জানা থাকা জরুরী। যা দ্বারা বাক্যের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট হওয়া ও বাক্যকে তুলনা করা এবং ইশারার মাধ্যমে কোন বিষয় বুঝিয়ে দেয়া ইত্যাদি বিষয়ের অবস্থা জানা যায়।

(৭) ইলমে বাদী জানা থাকা জরুরী। যা দ্বারা বাক্যের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। এই তিনটি বিদ্যাকে ৫, ৬, ৭, নং ইল্‌মের সমষ্টিকে বালাগাত বা অলংকার শাস্ত্র বলা হয়। তাফসীরের জন্য এগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যা। কারণ কোরআন পাকের সাহিত্য ও ভাষা এত উচ্চাঙ্গের এগুলো এর দ্বারাই প্রমাণিত হয়। যার মোকাবেলা করতে কাফেররা চিরদিন অক্ষম রয়েছে।

(৮) ইলমে কেরাত জানা থাকা জরুরী। এটাও তাফসীরের জন্য একটা জরুরী বিদ্যা। কারণ ক্বিরাতের ভিন্নতার কারণে অর্থও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে এবং একটা অর্থ অন্য আরেকটা অর্থের উপর প্রাধান্য পায়।

(৯) ইলমে আকাঈদ জানা থাকা জরুরী। এটাও তাফসীরের জন্য অতীব জরুরী বিদ্যা। কেননা কোরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যা জাহেরীভাবে আল্লাহ পাকের ব্যাপারে ব্যবহার করা সঠিক নয়। যেমন এ আয়াত يدالله فوق ايديهم অর্থাৎ সাহাবাগণের হাতের উপর আল্লাহ পাকের হাত রয়েছে।

(১০) উসূলে ফেকা জানা থাকা জরুরী। যা দ্বারা শরীয়তের মাসআলা বের করার দলীল প্রমাণ জানা যায়।

(১১) শানে নুযূল জানা থাকা জরুরী। অর্থাৎ আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ জানা। এর দ্বারা আয়াতের আসল অর্থ স্পষ্ট হয়ে যাবে। অনেক সময় শানে নুযূল জানা ব্যতীত আসল অর্থ বুঝা যায় না।

(১২) নাসেখ আয়াত ও মানসুখ আয়াত জানা থাকা জরুরী। অর্থাৎ রহিতকারী ও রহিত আয়াত কোনটি তা জানা থাকা জরুরী। পরিবর্তনকারী ও পরিবর্তিত আয়াত সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা থাকতে হবে। যাতেকরে শরীয়তের উপর আমল করা সঠিক অর্থে হয়।

(১৩) ইল্‌মে ফেকাহ জানা থাকা জরুরী। অর্থাৎ ইসলামী আইনশাস্ত্রের জ্ঞান পরিপূর্ণভাবে থাকতে হবে। কেননা শাখাগত মাসআলা দ্বারা তার আসল অর্থ বুঝা যায়।

(১৪) ইল্‌মে হাদীস জানা থাকা জরুরী। অর্থাৎ কোরআন পাকের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ব্যাখ্যা যে সমস্ত হাদীস দ্বারা হয় তার বিস্তারিত অর্থ জানা যায়।

(১৫) ইল্‌মে লাদুন্নী পাওয়া জরুরী। সর্বোপরি আল্লাহ প্রদত্ত বাতেনী ইল্‌ম হাসিল হওয়াও নিতান্ত জরুরী। এটা আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুদান। যা তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদেরকে তিনি দান করে থাকেন। 

(শরীয়ত ও তরিকত কা তালাজুম)

Leave a comment