উলামায়ে দেওবন্দের আক্বিদা-বিশ্বাস

shutterstock_58382248

ভূমিকা:

 

দেওবন্দী বরেণ্য আলেমগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

 

একাদশ শতাব্দীতে মুজাদ্দিদে আল-ফেসানী রহ. ও তার খলিফাগণ এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে শাহ ওয়ালী্উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. ও তাঁর পরিবারের উলামায়ে কেরামগণ ভারত উপমহাদেশে আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবাণীতে ইলম ও আমল তথা শরীয়তের ও ত্বরীকতের এক উজ্জল বাতি প্রজ্জলিত করেন। সেই বাতির আলোর দিশা নিয়ে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ মুহূর্তে মুজাদ্দিদে আল-ফেসানী রহ. ও শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. এর ইলম ও আধ্যাত্ত্বিকতার যোগ্য উত্তরসূরী হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. ও কুতবুল ইরশাদ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. ইসলামী বিশ্বকে আলোকিত করেন।এই দুই মহান ব্যক্তিত্ত্ব বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে ছিলেন ইলম ও আধ্যাত্ত্বিকতার নূরে আলোকিত। রাসূল স. এর পরিপূর্ণ অনুসরণ তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। প্রিয় নবীজী স. এর মহব্বত তাদের শরীরের প্রতিটি লোমকূপে ব্যাপ্ত ছিলো।

 

তাউহীদ ও সুন্নতের প্রচার-প্রসার এবং শিরক-বিদয়াত মূলোৎপাটনে তারা তাদের সমগ্র জীবন ব্যায় করেছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদা-বিশ্বাস ও ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাব তাদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. এর তাকলীদের ব্যাপারে এবং মাযহাব বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিপক্ষে তারা আপোষহীন ছিলেন। যাহিরী ইলমের পাশাপাশি বাতেনী ইলমের ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন অতুলনীয়।তারা উভয়ে ইমামুল আউলিয়া কুতবুল আরেফীন হযরত মাওলানা হাযী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কী রহ. এর আধ্যাত্ত্বিকতার ধারক-বাহক ছিলেন। আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে তারা এমন স্তরে উন্নীত হয়েছিলেন যে, তাদের সম্পর্কে স্বয়ং হাযী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ যিয়াউল কুলুবে লিখেছেন,

 

[যারা আমার আমার প্রতি আস্থা ও মহব্বত রাখেন, আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, মওলভী রশীদ আহমাদ ও মওলভী মুহাম্মাদ কাসেম যাহেরী ও বাতেনী ইলমের ক্ষেত্রে আমার স্থলে বরং আমার চেয়ে বহুগুণ উপরে উন্নীত হয়েছেন।যদিও বাহ্যিকভাবে বিষয়টি উল্টো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা আমার অবস্থানে এবং আমি তাদের অবস্থানে থাকা কর্তব্য ছিলো। তাদের সংশ্রব অবলম্বনকে গণীমত মনে করবে। বর্তমান সময়ে এমন লোক দুর্লভ। তাদের বরকতপূর্ণ সংশ্রব থেকে উপকৃত হবে। আত্মশুদ্ধি ও সুলুকের যেই পদ্ধতি এই কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, তাদের নিকট থেকে তা শিখবে।ইনশাআল্লাহ কেউ বন্চিত হবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের আয়ূ বরকতপূর্ণ করুন। সব আধ্যাত্ত্বিক নেয়ামত ও নৈকট্য্ দানে আল্লাহ তাদেরকে ধন্য করুন। তাদেরকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন এবং তাদের মাধ্যমে হেদায়াতের আলো দ্বারা সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করুন। আমীন।]

 

চিশতী সিলসিলায় হাযী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর আত্মশুদ্ধির মেহনত আরব-অনারবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ইমামুল আউলিয়া হাযী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. এর এই সাক্ষ দানের পর তাদের মর্যাদা বর্ণনায় অন্য কারও বক্তব্যের প্রয়োজন নেই।

 

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ:

 

মোগল সাম্রাজ্যের শোচনীয় অধ:পতনের পর ইসলামের নিকৃ্ষ্ট ও চতুর শত্রু ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠী সমগ্র ভারত উপমহাদেশে তাদের স্বৈর শাসন প্রতিষ্ঠা করলো।দীঘর্ এক শতাব্দীর শোষণ-নির্যাতনের পর ১৮৫৭ সালে উলামায়ে কেরাম ও স্বাধীনতাকামী মানুষ ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের পরে এটিই ছিলো সব চেয়ে বড় বিপ্লব। ইতিহাসে এটি সিপাহী বিপ্লব নামে প্রসিদ্ধ।১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে ছিলেন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.। আকাবিরে দেওবন্দ হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহ.), হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী ও হযরত মাওলানা যামেন সাহেব

 

এই বিপ্লব সফল করার জন্য সবরআত্বক চেষ্টা করেন। ১৮৫৭ সালের কিয়ামতসম বিভীষিকার পর ইংরেজ সরকার তের হাজারের বেশি আলেমকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিলো। হাজার হাজার মুজাহিদকে নৃশংস নির্যাতনের মুখোমুখি করে। এভাবে ইংরেজ সরকার অকথ্য যুলুম-নির্যাতনের ভারত উপমহাদেশের জনগণকে অবদমিত করে। বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মসনদকে সুদৃঢ় করার পর ইংরেজদের নাপাক চেতনা ছিলো, কিভাবে মুসলমানদের মন ও মস্তি্স্ক থেকে ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের শেষ চিহৃটুকু মিটিয়ে দেয়া যায়। মুসলমানদের মাঝে কুরআনী শিক্ষার ধারা বিনষ্টের জন্য তারা গভীর ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে। ফলে লর্ড মেকেল ও তার শিক্ষা কমিটি নিচের প্রতিবেদন পেশ করে,

 

[আমাদের এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করা উচিৎ যারা আমাদের ও আমাদের লক্ষ-কোটি প্রজার প্রতিনিধিত্ব করবে। তারা এমন একটি দল হবে, যারা রক্ত ও বর্ণে হিন্দুস্তানী হবে, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, রুচিবোধ ও মন-মানসে ইংরেজ হবে।]

 

দারুল উলুম দেওবন্দের ভিত্তি প্রস্তর:

 

ইংরেজ বেনিয়া সরকারের গভী ষড়যন্ত্র ও ফেরআউনী চিন্তা-ধারা সম্পর্কে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. পূর্ব থেকেই সচেতন ছিলেন। ১৮৫৭ সালের আন্দোলনের ব্যর্থতা ও পরবর্তীতে নৃশংসভাবে উলামায়ে-কেরামকে হত্যার বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে কাসেম নানুতুবী রহ. উপমহাদেশে মুসলমানদের অস্তিত্ব ও ইমাম-আক্বিদা রক্ষার ব্যাপারে শংকিত হয়ে পড়েন। ইসলামী আক্বিদা-বিশ্বাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ১৫ ই মহররম ১২৮৩ হি: মোতাবেক ১৮৬৭ সালে দেওবন্দ নামক এলাকায় ছাতা মসজিদে একটি ডালিম গাছের নিচে ইতিহাসখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা হয়। ঐতিহাসিক এই শিক্ষাঙ্গণের সর্বপ্রথম উস্তাদ ছিলেন, আল্লামা মাহমুদ সাহেব রহ. এবং সর্বপ্রথম ছাত্র ছিলেন, শাইখুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান রহ.। আল্লাহ পাকের মেহেরবাণীতে ডালিম গাছের নিচে শুরু হওয়া এই মাদ্রাসাটি ইলম ও আমলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অদ্যাবধি মুসলিম উম্মাহের বিরাট অংশ এই দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।এই প্রতিষ্ঠান থেকে এমন সব যুগ শ্রেষ্ঠ আলেমের জন্ম হয়েছে, যাদের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ক্ষণজন্মা এই মহা মণীষীদের ইলমী ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। রাসূল স. এর আনীত চার মিশনের সফল বাস্তবায়নে বর্তমান বিশ্বে এই দারুল দেওবন্দ নেতৃত্বের আসনে সমাসীন। আল্লাহ পাকের মেহেরবাণীতে সমগ্র পৃথিবীর তা’লীম (শিক্ষা), তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি), দাওয়াত ও জিহাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন দেওবন্দের উলামায়ে কেরামগণ। তাকওয়া-ত্বহারাত ও ইবাদত-বন্দেগীতে তারা যেমন অতুলনীয়, মুসলিম উম্মাহ ও তাদের ইমান-আক্বিদা সংরক্ষণে সব ধরণের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় তারা ইস্পাত কঠিন। রুহবানুল লাইল ও ফুরসানুন নাহার (রাতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন, দিনে শত্রুর মোকাবেলায় অদম্য অশ্বারোহী) প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হলেন উলামায়ে দেওবন্দ।যুগ যুগ ধরে উলামায়ে দেওবন্দ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মুসলিম উম্মাহ ও তাদের দ্বীন-ইমান রক্ষায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছেন।

 

একটি তাকফীরি ফেতনা:

 

ইংরেজরা স্বাধীনতাকামী দেওবন্দের এই আলেম শ্রেণিকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করতো। মুসলিম সমাজে যখন তারা দারুল উলুম দেওবন্দ ও এর উস্তাদ-ছাত্রের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করলো, তখন তারা দ্বীনের এই ধারাকে বন্ধ করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র ও কুট-কৌশলের আশ্রয় নিলো। কিছু দুনিয়াদার মওলভী ও পীরকে টাকার বিনিময়ে ক্রয় করে তাদের মাধ্যমে দেওবন্দের অনুসারীগণকে ওহাবী অপবাদ আরোপ করতে শুরু করলো। ইতোপূর্বে ইংরেজ সরকার ইমামুল মুজাহিদীন সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ রহ. ও আলেমে রব্বানী শাহ ইসমাইল শহীদ রহ. এর আন্দোলনকেও ওহাবী সিল লাগিয়ে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছিলো। পরবর্তীতে কট্রর বেদয়াতী মতবাদ বেরেলভী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ রেজা খাঁ বেরেলভী এই তাকফীরি ফেতনায় ইন্ধন যোগায়।

 

হুসসামুল হারামাইন এর বাস্তবতা: মওলভী আহমাদ রেজা খাঁ বেরেলভী ১৩২৩ হি: হজ্বের উদ্দেশ্যে সফর করে। হজ্ব শেষে তিনি মক্কা শরীফে একটি পুস্তক রচনা করলেন। এই পুস্তকে তিনি বেশ কয়েকজন বরেণ্য উলামায়ে দেওবন্দের বক্তব্যকে শাব্দিক ও অর্থগতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করে। দেওবন্দের উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে সে এই বিকৃত পথে এমন কিছু অপবাদ আরোপ করে, যা তাদের সম্পর্কে কল্পনা করাও অসম্ভব। সে এই কিতাবে লিখেছে, দেওবন্দী আলেমরা তাদের কিতাবে আল্লাহ তায়ালাকে মিথ্যুক বলেছেন এবং রাসূল স. কে গালি দিয়েছে। এ পুস্তকে সে প্রথম ভন্ড নবুওয়াতের দাবীদার গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর কুফুরী বক্তব্য উল্লেখ করেছে। এরপর, দেওবন্দের বড় বড় আলেমকে ওহাবী কাযযাবী দল, ওহাবী শয়তানী দল ইত্যাদিতে বিভক্ত করে বিভিন্ন শিরোনাম দিয়েছে। তার এই চতুরতার মূল উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষ যেন গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর মতো উলামায়ে দেওবন্দকেও কুফুরী আক্বিদার অনুসারী একটি দল মনে করে। এ পুস্তকে সে আকাবিরে দেওবন্দ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ, কুতবুল ইরশাদ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. ফখরুল আরেফীন হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ ও হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত শাহ আশরাফ আলী থানবী রহ. এর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থান করে তাদের সবাইকে সুনিশ্চিত কাফের ফতোয়া দিয়েছে এবং এও লিখেছে যে, যারা তাদেরকে কাফের মনে করবে না, তারাও কাফের। বিভিন্ন পদ্ধতি ও সাজশের মাধ্যমে আহমদ রেজা খাঁ মক্বা-মদীনার আলেমগণের সাক্ষ্য গ্রহণের চেষ্টা করতে থাকে।

 

মক্কা-মদীনার উলামায়ে কেরামের নিকট উলামায়ে দেওবন্দের আক্কিদা-বিশ্বাস্ ও তাদের লিখনী পরিচিত না থাকায়, অনেকেই সেখানে ফতোয়া দেয়ার সময় বলেন যে, যদি বাস্তবেই তাদের আক্বিদা এমন হয়ে থাকে, তবে তারা কাফের হবে।হজ্জ থেকে ফিরে কিছুদিন চুপ-চাপ থেকে ১৩২৫ হি: আহমাদ রেজা খাঁ উক্ত পুস্তিকাটি হুসসামুল হারামাইন নামে প্রকাশ করে। দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের যেসমস্ত বক্তব্যকে বিকৃত করে চরম খেয়ানতের পরিচয় দিয়ে কট্রর বেদয়াতী আহমাদ রেজা খাঁ যে ফতোয়াবাজি করেছিলো, তার স্বরূপ জানতে ড. আল্লামা খালিদ মাহমুদ সাহেবের মুতালায়ে বেরেলভীয়াত নামক বইটি পড়ার অনুরোধ রইল। এছাড়াও শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এর আশ-শিহাবুস সাকিব, হযরত মাওলানা মনজুর নু’মানী সাহেব রহ. এর ফয়সালা কুন মুনাজারা অধ্যয়ন করতে পারেন।

 

আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ:

এ সময় হযরত হোসাইন আহমাদ মাদানী রহ. মদীনা শরীফে অবস্থান করছিলেন। মসজিদে নববীতে হযরতের দরস বেশ প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলো। হুসসামুল হারামাইন এর কার্যক্রম এমন গোপনীয়তার সাথে করা হয়েছিলো যে, হোসাইন মাদানী রহ. তৎক্ষনাৎ এসম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরবর্তীতে যখন এ সম্পর্কে জানতে পারেন, তিনি হারামাই শরীফাইনের আলেমগণকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন।হারামাইন শরীফাইনের আলেমগণ দেওবন্দেরে উলামায়ে কেরামের এর নিকট ২৬ টি প্রশ্ন সম্বলিত একটি চিঠি পাঠালেন। বিশুদ্ধ আরবীতে উক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করেন ফখরুল মুহাদ্দিসীন হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ.। খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. এই উত্তরের উপর তৎকালীন দেওবন্দের সমস্ত উলামায়ে কেরাম সত্যায়ন ও সাক্ষ্যর করেন। যেমন, শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ, হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ, উসওয়াতুস সুলাহা হযরত মাওলানা শাহ আব্দুর রহীম রাইপুরী রহ, বাকিয়্যাতুস সালাফ হযরত মাওলানা হাফেজ মুহাম্মাদ আহমাদ সাহেব, মুফতী আজম হযরত মাওলানা কিফায়াতুল্লাহ সাহেব। এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের সত্যায়নের পাশাপাশি হিজায, মিশর, শাম ও আরবের বিখ্যাত আলেমগণের সত্যায়ণ রয়েছে এই পুস্তকের উপর। খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. এর পুস্তকটি ১৩২৫ হি: সনে প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকের নাম ছিলো আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ। এ পুস্তকে উক্ত প্রশ্নগুলোর আলোকে বিশুদ্ধ আক্বীদা-বিশ্বাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই পুস্তক সংক্ষিপ্ত হলেও এখানে দেওবন্দী আক্বিদার মৌলিক বিষয়গুলো খুবই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বস্তরের দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের সত্যায়ন থাকায় পুস্তকটি দেওবন্দী আক্বিদা বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সনদ অর্জন করেছে।

 

بسم الله الرحمن الرحيم

 

أيها العلماء الكرام ، و الجهابذة العظام ، قد نسب إلى ساحتكم الكريمة أناسٌ عقائد الوهابية ، و أتوا بأوراق و رسائل لا تعرف معانيها لاختلاف اللسان ، نرجو أن تخبرونا بحقيقة الحال و مرادات المقال ، و نحن نسألكم عن أمور اشتهر فيها خلافُ الوهابية عن أهل السنة و الجماعة

 

বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ও বিদগ্ধ ইসালামী পন্ডিতগণ, কিছু লোক আপনাদেরকে দিকে ‘ওহাবী’ হওয়ার অপবাদ আরোপ করেছে। তারা কিছু পুস্তক এনেছে, অনারবী ভাষা হওয়ার কারণে যার অর্থ ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। আপনাদের প্রকৃত অবস্থান ও বক্তব্যসমূহের প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের নিকট ব্যাখ্যা করবেন বলে আশাবাদী। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সাথে ওহাবীদের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য কামনা করছি।

 

السؤال الأول و الثاني

 

ما قولكم في شدّ الرحال إلى زيارة سيّد الكائنات عليه أفضل الصلوات و التحيات و على آله و صحبه أيّ الأمرين أحبّ إليكم و أفضل لدى أكابرِكم للزائر ، هل ينوي وقتَ الارتحال للزيارة زيارتَه عليه السلام أو ينوي المسجدَ أيضاً ، و قد قال الوهابيةُ: إنّ المسافر إلى المدينة لا ينوي إلا المسجدّ النبويّ .

 

 প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্ন:

 

সাইয়্যেদুল কায়েনাত রাসূল স. এর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা সম্পর্কে আপনাদের অভিমত কী? কবর যিয়ারতকারীর জন্য আপনাদের পূর্বসূরী ও আপনাদের নিজস্ব অভিমত কী? যিয়ারতকারী ব্যক্তি যাত্রার সময় রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের নিয়ত করবে না কি মসজিদে নববীর যিয়ারতের নিয়ত করবে? ওহাবীদের বক্তব্য হলো, মদীনার উদ্দেশ্যে সফরকারী শুধু মসজিদে নববীর যিয়ারতের নিয়ত করবে।

 

 

 

الجواب

 

 

 

بسم الله الرحمن الرحيم

 

و منه نستمدّ العون و التوفيق و بيده أزِمّة التحقيق

 

حامداً و مصلياً و مسلِّماً

 

 

 

ليعلم أوّلاً قبل أن نشرع في الجواب أنا – بحمد الله – و مشايخَنا رضوان الله عليهم أجمعين و جميعَ طائفتِنا و جماعتنا : مقلّدون لقدوة الأنام و ذروة الإسلام الإمام الهُمام الإمام الأعظم أبي حنيفة النعمان رضي الله عنه في الفروع

 

و متّبعون للإمام الهُمام أبي الحسن الأشعريّ و الإمام الهمام أبي منصور الماتُرِيْدِيّ رضي الله تعالى عنهما في الاعتقاد و الأصول

 

و منتسِبون من طُرق الصوفيّة إلى الطريقة العليّة المنسوبة إلى السادة النَقْشَبَنْدِيَّة ، و الطريقة الزكيّة المنسوبة إلى السادة الجِشْتِيَّة ، و الطريقة البَهِية المنسوبة إلى السادة القادِرِيّة ، و الطريقة المرضيّة المنسوبة إلى السُهَرْوَرْدِيَّة رضي الله تعالى عنهم أجمعين

 

 

 

ثم ثانياً أنا لا نتكلم بكلام و لا نقول قولاً في الدين إلاّ و عليه عندنا دليلٌ من الكتاب أو السنّة أو إجماع الأمّة أو قولٍ من أئِمة المذهب - و مع ذلك لا ندّعِي أنا مُبَرَّؤون من الخطأ و النسيان في ضلة القلم و زلّة اللسان ، فإنْ ظهَر لنا أنا أخطأنا في قول ، سواءً كان من الأصول أو الفروع ، فما يمنعُنا الحياءُ أنْ نرجعَ عنه و نُعلِنَ بالرجوع ، كيف لا و قد رجع أئِمَّتُنا رضوان الله عليهم في كثير من أقوالهم حتى أن إمامَ حرمِ الله تعالى المحترَم إمامَنا الشافعي رضي الله عنه رجعوا في مسائل إلى أقوال بعضهم كما لا يخفى على متبع الحديث

 

فلو ادَّعى أحد مِن العلماء أنا غلطنا في حكم ، فإن كان من الاعتقاديات فعليه أن يُثبت دعواه بِنصّ من أئمة الكلام ، و إن كان من الفرعيات فيلزم أن يَبني بنيانه على القول الراجح من أئمة المذهب ، فإذا فعل ذلك فلا يكون منا – إن شاء اللهُ تعالى - إلا الحسنى ، القبول بالقلب و اللسان و زيادة الشكر بالجنان و الأركان

 

 

 

و ثالثاً أن في أصل اصطلاح بلاد الهند كان إطلاق ‘ الوَهَّابِيّ ’ على من ترَك تقليد الأئمة رضي الله تعالى عنهم

 

ثم اتّسع فيه و غلب استعماله على من عمل بالسنة السَنِيّة و ترَك الأمور المستحدَثة الشنيعة و الرسومَ القبيحة حتى شاع في ( بمبيء ) و نواحيها أن مَن منَع عن سجدة قبور الأولياء و طوافِها فهو ‘وهّابيّ’ بل و مَن أظهر حرمةَ الرِّبا فهو وهابيّ و إن كان مِن أكابر أهل الإسلام و عظمائِهم

 

ثم اتّسع فيه حتى صار سبّاً ، فعلى هذا لو قال رجل من أهل الهند لرجل أنه وهابي فهو لا يدل على أنه فاسد العقيدة بل يدل على أنه سُنِّيٌّ حنفيّ عامل بالسنة مجتنب عن البدعة خائف من الله تعالى في ارتكاب المعصية

 

و لما كان مشايخنا رضي الله تعالى عنهم يسعون في إحياء السنة و يشمرون في إخماد نيران البدعة غضب جندُ إبليس عليهم و حرفوا كلامهم و بَهَتُوْهم و افتروا عليهم الافتراءات و رموهم بالوهابيّة و حاشاهم عن ذلك بل و تلك سنّة الله التي سَنها في خواصّ أوليائِه كما قال الله تعالى في كتابه :

 

" و كذلِك جَعلْنا لِكُلِّ نَبِيّ عَدُوّاً شياطِينَ الإنسِ و الجنِّ يُوْحِيْ بعضُهم إلى بعضٍ زُخْرُفَ القولِ غُروراً وَ لوْ شاءَ ربُّك ما فعَلوْه فَذَرْهُمْ و ما يفترُوْن "

 

فلمّا كان ذلك في الأنبياء صلوات الله عليهم و سلامه وجب أن يكون في خلفائهم و من يقوم مقامَهم

 

كما قال رسولُ الله صلى الله عليه و سلم : " نحن معاشر الأنبياء أشدّ الناس بلاءً ثم الأمثل فالأمثل "

 

ليتوفر حظهم و يكمل لهم أجرهم فالذين ابتدعوا البدعات و مالوا إلى الشهوات و اتّخذوا إلهَهم الهوى و ألقوا أنفسهم في هاوية الردى يفترون علينا الأكاذيب و الأباطيل و ينسبون إلينا الأضاليل فإذا نُسب إلينا في حضرتكم قولٌ يخالف المذهب فلا تلتفتوا إليه و لا تظنوا بنا إلا خيراً و إن اختلج في صدوركم فاكتبوا إلينا فإنا نخبركم بحقيقة الحال و الحق من المقال فإنكم عندنا قطب دائرة الإسلام

 

 

 

বিশদ উত্তরের পূর্বে আমরা কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই,

 

প্রথমত: আমাদের শায়খগণ, আমাদের সমস্ত জামাত ও দল আল-হামদুলিল্লাহ শাখাগত মাসআলা-মাসাইলের ক্ষেত্রে ইমাম আ’জম ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাযহাবের অনুসারী। উসুলুদ্দীন তথা দ্বীনের মৌলিক আক্বিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. ও ইমাম আবু মনসুর মাতুরীদি রহ. এর অনুসারী। সুলুক ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া, কাদেরীয়া ও সোহরাওয়াদীয়া ত্বরীকার সাথে সম্পর্ক রাখি।

 

দ্বিতীয়ত: আল্লাহর কিতাব, রাসূল স. এর সুন্নাহ, ইজমায়ে উম্মত অথবা গ্রহণযোগ্য কোন ইমামের বক্তব্য ছাড়া আমরা দ্বীনি বিষয়ে কোন কথা বলি না। তবে আমরা কখনও এ দাবী করি না যে, বলা্ ও লেখার ক্ষেত্রে আমরা ভুলের উর্ধ্বে। দ্বীনের মৌলিক আক্বিদা বিষয়ে হোক, কিংবা শাখাগত কোন মাসআলা হোক, যদি সুম্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, এক্ষেত্রে আমরা ভুল করেছি, তবে আমরা উক্ত মাসআলা থেকে ফিরে সঠিক বিষয় গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা কোন ধরণের সংকোচ ও লজ্জা বোধ করি না। নিদ্বিধায় আমরা আমাদের ভুলের ঘোষণা করে প্রকাশ্যে সঠিক বিষয়টা গ্রহণ করে থাকি। এ ব্যাপারে সংকোচের কী আছে? অথচ আমাদের ইমাম আবু হানিফা রহ. অনেক মাসআলায় পরবতীতে মত পরিবর্তন করেছেন, এমনকি ইমাম শাফেয়ী রহ. অনেক মাসআলায় পূর্ববর্তী মত ত্যাগ করে নতুন মতামত পেশ করেছেন। ইলমুল হাদীসের একজন সাধারণ ব্যক্তিও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে।

 

কোন আলেম যদি দাবী করেন, আমরা কোন মাসআলায় ভুল করেছি, আক্বিদা সংশ্লিষ্ট বক্তব্য হলে ইলমুল কালামের ইমামগণের বক্তব্য দ্বারা আমাদর মাসআলাকে ভুল সাব্যস্ত করবে, আর যদি শাখাগত কোন বিষয় হয়, তবে আমাদের মাযহাবে গ্রহণযোগ্য ও ফতোয়ার উপযুক্ত বক্তব্য দ্বারা আমাদেরকে ভুল প্রমাণিত করবে। কোন আলেম যদি উপর্যুক্ত নীতির আলোকে আমাদের ভুল প্রমাণিত করে, তবে আমাদের পক্ষ থেকে উত্তম আচরণ প্রত্যক্ষ করবে। তার বক্তব্যকে আমরা মনে-প্রাণে সাদরে গ্রহণ করবো। উপরন্তু অন্তর থেকে আমরা তার শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবো।

 

তৃতীয়ত: হিন্দুস্তানের পরিভাষা অনুযায়ী ‘ওহাবী’ শব্দটি শুরুতে যারা মাযহাব পরিত্যাগ করতো কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হতো। এরপর, এই পরিভাষার ব্যাপক অপব্যবহার শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা রাসূল স. এর সুন্নাহের উপর আমল করে, প্রচলিত নিকৃষ্ট বিদয়াত ও কু-সংস্কার থেকে বেঁচে থাকে তাদেরকে ওহাবী সম্বোধন করা হতে থাকে। এমনকি মোম্বাই ও তার আশে-পাশের এলাকায় যারা কবরে সিজদা ও ত্বওয়াফ করতে অস্বীকার করে তাদেরকে ওহাবী বলা হতে থাকে। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, কেউ সুদ হারাম একথা বললেও তাকে ওহাবী বলা হয়, যদিও তিনি মুসলমানদের বড় কোন ইমাম বা শায়খ হোন। অত:পর, এই ওহাবী শব্দের ব্যবহার আরও একধাপ বিকৃত হয়ে গালিতে পরিণত হয়। সুতরাং হিন্দুস্তানের কেউ যদি কাউকে ওহাবী বলে, তবে এটা প্রমাণ করে না যে, সে বাতিল আক্বিদার অনুসারী বরং এটা প্রমাণ করে যে, সে হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করে থাকে এবং বিদয়াত ও কু-সংস্কার থেকে দূরে থেকে রাসূল স. এর সুন্নত অনুসরণ করে। বিদয়াত ও গোনাহে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সে আল্লাহকে ভয় করে। আমাদের মাশায়েখ ও উলামায়ে কেরামগণ যখন বিদয়াত অপসারণ ও সুন্নত পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন শুরু করে, ইবলিসের চেলারা তাদের উপর রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তারা তাদের বক্তব্যকে বিকৃত করে, তাদেরকে বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে, এবং তাদের নামে সমাজে মনগড়া বক্তব্য ও মিথ্যা ছড়াতে থাকে। তাদেরকে এরা ওহাবী অপবাদে অভিযুক্ত করে। অথচ এসমস্ত অভিযোগের সাথে আমাদের উলামায়ে কেরামের ন্যুনতম কোন সম্পর্ক নেই। হক্বপন্থী উলামায়ে কেরামের উপর এধরনের অপবাদ আরোপের বিষয়টি একটি চিরাচরিত নিয়ম। আল্লাহর তায়ালার অধিক নৈকট্যশীল ব্যক্তিরা এধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে থাকে। এসম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,  وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِىٍّ عَدُوًّا شَيَٰطِينَ ٱلْإِنسِ وَٱلْجِنِّ يُوحِى بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ ٱلْقَوْلِ غُرُورًا ۚ وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ ۖ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না। অতএব, আপনি তাদেরকে এবং তাদের মিথ্যাপবাদকে মুক্ত ছেড়ে দিন।

 

যেহেতু নবীদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে, সুতরাং তাদের অনুসারী ও স্থলাভিষিক্তদের সাথে এমনটা হওয়া বেশ স্বাভাবিক। রাসূল স. এর পবিত্র ইরশাদ, ‘আমরা নবীগণ সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা ও মুসী্বতের মুখোমুখি হই। অত:পর, পর্যায়ক্রমে যারা নবীদের সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য রাখে। এভাবে তাদেরকে পূর্ণভাবে পরীক্ষা করা হয়, যেন তারা এর উত্তম প্রতিদান লাভ করে’। যারা বিভিন্ন ধরণের বিদয়াতের প্রচলন ঘটিয়েছে, প্রবৃত্তিপূজায় আত্ম-বিসর্জন দিয়েছে, নিজের নফসকে প্রভূ বানিয়েছে এবং নিকৃষ্ট ও গর্হিত কাজে যারা আকুণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছে, তারা আমাদের উপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করেছে, আমাদের নামে মিথ্যাচার করেছে, বিভিন্ন ভ্রান্ত বক্তব্য আমাদের দিকে সম্পৃক্ত করেছে। আমাদের প্রসিদ্ধ মাযহাবের বিপরীতে এরা যদি আমাদের নামে কোন শরীয়ত বিরোধী বক্তব্য সম্পৃক্ত করে, তাদের এসমস্ত বক্তব্যের প্রতি কর্ণপাত করবেন না, এবং আমাদের প্রতি কোন বিরূপ মনোভাব রাখবেন না। আমাদের প্রতি কোন বিষয়ে আপনাদের সন্দেহের উদ্রেক হয়, আমাদেরকে বিষয়টি অবহিত করুন, ইনশাআল্লাহ আমরা আপনাদের সামনে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরবো। কারণ, আমাদের দৃষ্টিতে আপনারা হলেন, বর্তমান সময়ের মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু।

 

توضيح الجواب

 

عندنا و عند مشايخنا زيارةُ قبر سيد المرسلين ( روحي فداه ) من أعظم القربات ، و أهم المثوبات ، و أنجح لنيل الدرجات ، بل قريبة من الواجبات ، و إن كان حصوله بشدّ الرحال ، و بذل المهج و الأموال ، و ينوي وقت الارتحال زيارتَه عليه ألفُ ألف تحية و سلام ، و ينوي معها زيارةَ مسجده صلى الله عليه و سلم و غيرِه من البقاع و المشاهدات الشريفة ، بل الأوْلى ما قال العلامة الهمام ابن الهمام أن يجرّد النية لزيارة قبره عليه الصلاة و السلام ثم يحصل له إذا قدم زيارةُ المسجد ، لأن في ذلك زيادةَ تعظيمه و إجلالِه صلى الله عليه و سلم ، و يوافقه قولُه صلى الله عليه وسلم : " من جاءني زائراً لا تحمله حاجةٌ إلا زيارتي كان حقاً عليّ أن أكون شفيعاً له يوم القيامة "

 

و كذا نُقل عن العارف السامي الملا جامي أنه أفرد الزيارة عن الحج و هو أقرب إلى مذهب المُحِبِّيْن

 

 

 

و أما ما قالت الوهابيةُ من أن المسافر إلى المدينة المنورة على ساكنها ألف ألف تحية لا ينوي إلا المسجد الشريف استدلالاً بقوله عليه الصلاة و السلام : " لا تشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد " : فمردودٌ ، لأن الحديث لا يدلّ على المنع أصلاً بل لو تأمّل ذو فهمٍ ثاقب لَعلِم أنه بدلالة النص يدل على الجواز ، فإن العلة التي استثني بها المساجد الثلاثة من عموم المساجد أو البقاع : هو فضلُها المختصّ بها ، و هو مع الزيادة موجودٌ في البقعة الشريفة ، فإن البقعة الشريفة و الرحبة المنيفة التي ضم أعضائه صلى الله عليه و سلم أفضل مطلقاً حتى من الكعبة و من العرش و الكرسيّ كما صرّح به فقهائنا رضي الله عنهم ، و لما استثني المساجد لذلك الفضل الخاص فأولى ثم أولى أن يستثني البقعة المباركة لذلك الفضل العام

 

 

 

و قد صرح بالمسألة كما ذكرنا ، بل بأبسط منها : شيخُنا العلامة شمس العلماء العاملين مولانا رشيد أحمد الكنكوهي قدس الله سره العزيز في رسالته ‘زبدة المناسك ’ في فضل زيارة المدينة المنورة و قد طبعت مراراً

 

و أيضاً في هذا المبحث الشريف رسالةٌ لشيخ مشايخنا مولانا المفتي صدر الدين الدهلوي قدس الله سره العزيز أقام فيها الطامّة الكبرى على الوهابية و مَن وافقهم و أتى ببراهين قاطعة و حُجَج ساطعة سماها ‘أحسن المقال في شرح حديث لا تشد الرحال’ طبعت و اشتهرت فليراجع إليها و الله تعالى أعلم

 

 

 

জবাবের বিস্তারিত বিবরণ: আমাদের পূর্ববর্তী মাশায়েখ ও আমাদের নিকট রাসূল স. এর করব যিয়ারত আল্লাহর অধিক নৈকট্য লাভের অনত্যম মাধ্যম এবং বিশেষ পুণ্যের কাজ। উম্মতের জন্য এটি ওয়াজিব না হলেও ওয়াজিবের কাছাকাছি।

 

রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর: রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা এবং এর জন্য অর্থ ব্যয় করা একটি সওয়াবের কাজ। কেও যদি রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের পাশাপাশি মসজিদে নববী ও মদীনার অন্যান্য স্থান যিয়ারতের নিয়ত করে, তবে এতে কোন আপত্তি নেই। তবে এক্ষেত্রে আল্লামা ইবনুল হুমাম রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী উত্তম হলো, সফরের সময় শুধু রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের নিয়ত করা। সেখানে পৌঁছলে মসজিদে নববীর যিয়ারত তো এমনিতেই হয়ে যাবে। কেননা, এককভাবে রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের দ্বারা রাসূল স. এর প্রতি অধিক সম্মান প্রদর্শন করা হয় এবং রাসূল স. এর প্রতি যথার্থ মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়। এ বিষয়ে রাসূল স. এর হাদীস রয়েছে, যে ব্যক্তি অন্য কোন প্রয়োজন ছাড়া শুধু আমার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসবে, কিয়ামতের দিন তার শাফায়াত করা আমার দায়িত্ব। ওহাবীদের বক্তব্য হলো, মদীনা শরীফ যিয়ারতের মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়ত করতে হবে। তারা শাদ্দে রিহাল সংক্রান্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করে থাকে। রাসূল স.বলেছ, তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা নিষিদ্ধ প্রমাণে তাদের এ হাদীস কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এ হাদীস রাসূল স. এর কবর যিয়ারতকে নিষেধ করে না, বরং গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এ হাদীসের দালালাতুন নস দ্বারা কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর বৈধ প্রমাণিত হয়। কেননা, অন্যান্য মসজিদ থেকে তিনটি মসজিদকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের কারণ হলো, এ তিনটি মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি। মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে সফর এজন্য বৈধ হয়েছে যে, এর পাশে রাসূল স. এর রওযা শরীফ রয়েছে। আর রওযা শরীফে রাসূল স. সশরীরে অবস্থান করছেন। রাসূল স. দেহ স্পর্শকারী রওযা শরীফ শুধু মসজিদে নববী নয়, বরং কাবা শরীফ এমনকি আল্লাহর আরশ-কুরসী থেকেও সম্মানিত। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনটি মসজিদ যদি অন্যান্য মসজিদ থেকে বিশেষিত হয়, তবে রাসূল স. স্বশরীরে কবরে অবস্থানের কারণে এটিকে বিশেষিত করার ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকে না। ফকীহগণ এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

 

বিষয়টি স্পষ্ট ও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন, আমাদের শায়খ আল্লামা শামসুল উলামা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.।তিনি তাঁর যুবদাতুল মানাসিক কিতাবে রাসূল স. এর কবর যিয়ারতের ফযীলত অধ্যায়ে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কিতাবটি বহুবার মুদ্রিত হয়েছে। এছাড়াও ওহাবীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন, আমাদের শায়খগণের শায়খ মুফতী সদরুদ্দীন দেহলবী রহ. তাঁর আহসানুল মাকাল ফি শরহি হাদীসি লা তুশাদ্দুর রিহাল নামক পুস্তকে। এ পুস্তকে তিনি ওহাবী ও তাদের দোসরদের বক্তব্যকে অসার প্রমাণিত করেছেন এবং তাদের শক্তিশালী দলিলের আলোকে বিষয়টি প্রমাণিত করেছেন। পুস্তকটি বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়োজনে এটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

 

অনুবাদ:  ইজহারুল ইসলাম

Leave a comment