বন্ধুগণ! ইতিহাস সংরক্ষণ করুন

shutterstock_58382248

তথ্যের শক্তি অপরিমেয়। অনেক প্রবন্ধ ও বক্তৃতার চেয়ে কিছু বাস্তব তথ্যের উপস্থাপন অনেক বেশি কার্যকর। এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। বাস্তবতার উপযুক্ত উপস্থাপনা অতি নিপূণ মিথ্যাচারেরও সফল মোকাবেলা করে।

 

তথ্য-শক্তির সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত উইকিলিকস। উইকিলিকসের তথ্যগুলো গোটা পৃথিবীকে কী ঝাঁকুনিই না দিয়ে গেল! দেশীয় উদাহরণ হিসেবে দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায় : প্রথমটি হচ্ছে, স্কাইপি-সংলাপ ফাঁসের ঘটনা। দ্যা ইকোনোমিস্ট ও দৈনিক আমার দেশে সংলাপটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং ট্রাইবুনালের সংশ্লিষ্ট বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন।

 

এ সংলাপ প্রকাশের পক্ষে-বিপক্ষে যা কিছু বলা হয়েছে তা এ নিবন্ধের বিষয়বস্ত্ত নয়, এখানে শুধু তথ্য-শক্তির উদাহরণ দেওয়া উদ্দেশ্য।

 

দ্বিতীয় ঘটনা, দৈনিক ইনকিলাব ও দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত রাসূল-অবমাননার তথ্য। নিহত ব্লগার রাজিবের ব্লগে লিখিত চরম ঘৃণ্য ও কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হওয়ার পর সারা দেশে যেন আগুন ধরে গেল। বলাবাহুল্য, সরাসরি ঐ লেখাগুলো প্রকাশিত না হলে এ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হত না। পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহ আমার চোখের সামনে, সে বিষয়ে মন্তব্য বা পর্যালোচনাও এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।

 

বর্তমান যুগে প্রচারের শক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু প্রচারের বদৌলতে এখন দিনকে রাত আর রাতকে দিন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রচারের চেয়েও বেশি শক্তি তথ্যের। অপপ্রচার ততক্ষণই কার্যকর থাকে যতক্ষণ সঠিক তথ্য ময়দানে না আসে। সঠিক তথ্য প্রচারের আলোয় এসে গেলে সেটাই হয় অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের সফল মোকাবেলাকারী।

 

আমরা যেহেতু আদর্শের পক্ষের শক্তি তাই আমাদের অপপ্রচারের পথে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের প্রচার-উপাদান কেবল সত্য ও বস্ত্তনিষ্ঠ তথ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ জাতির, তথ্য ও প্রচার কোনোটিই আমাদের হাতে নেই। প্রচারের ময়দানে নিজস্ব অবস্থান তৈরির বিষয়ে যেমন আমাদের সামর্থ্য নিয়োজিত করছি না তেমনি সাধ্যানুযায়ী তথ্য-সংরক্ষণের বিষয়েও মনোযোগী হচ্ছি না। এই অবহেলা বা অসচেতনতার কুফল কিন্তু আমাদের পদে পদে ভুগতে হচ্ছে।

 

দেখুন, ‘আমি মজলুম’ বলে পাঁচবার চিৎকার করার চেয়ে ‘মজলুম হওয়ার চিত্র’ একবার উপস্থাপন অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু না আমরা ‘চিৎকার’ করতে পারছি, না মজলুম হওয়ার চিত্র তুলে ধরতে পারছি। কারণ প্রচার-মাধ্যমেও আমাদের কোনো অবস্থান নেই; তথ্য-সংরক্ষণেরও ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ বৈরী সমাজে সহানুভূতির আবহ সৃষ্টির জন্য এখন সাধারণ জাগতিক নিয়মে এই দুটি বিষয় হচ্ছে বিকল্পহীন উপায়।

 

বিশ্ব-ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ইহুদিরা এই কিছুকাল আগেও ছিল ছন্নছাড়া এক জাতি। কিন্তু তারাই আজ চেপে বসে আছে আরব জাহানের বুকের উপর। কিন্তু কীভাবে? শুধু পশ্চিমাদের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে 

 

الا بحبل من الله، وحبل من الناس

 

তবে এই সমর্থন ইহুদিরা একদিনে অর্জন করেনি। অনেক ত্যাগ ও কৌশলের বিনিময়ে তারা এই অসাধ্য সাধন করেছে। অসাধ্য-সাধন এজন্য বলছি যে, ধর্মীয়ভাবে ইহুদি-খৃস্টান বন্ধুত্ব কোনো কালেই ছিল না। থাকার কারণও নেই। বরং এই বন্ধুত্ব-যদি একে বন্ধুত্ব বলা যায়-বর্তমান সময়ের এক মহা বিস্ময়!

 

কিন্তু কীভাবে ঘটল এ বিস্ময়কর ঘটনা? উপায়-উপকরণের এই জগতে এর অন্যতম কারণ তথ্য ও প্রচার। ইহুদিরা দীর্ঘকাল ধরে গভীর অধ্যাবসায়ের সাথে তাদের নির্যাতিত হওয়ার কাহিনী বিশ্বময় প্রচার করেছে। এক্ষেত্রে ছোট বড় কোনো উপাদানকেই তারা অবহেলা করেনি। যার একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত এ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, যা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং অসংখ্য পাঠকের অশ্রু ঝরিয়েছে।

 

ইহুদি জাতির নির্যাতিত হওয়ার কারণ বা প্রচারিত কাহিনীর বাস্তবতা-অতিরঞ্জন আজ বিশ্ব-মানবের কাছে বিবেচ্য নয়, ‘ওরা নির্যাতিত’ এটুকুই এখন আছে স্মৃতিপটে ও দৃশ্যপটে।

 

কোনো সন্দেহ নেই, খোদ ইহুদি জাতিও তাদের অতীত থেকে শিক্ষাগ্রহণে প্রস্ত্তত নয়। আত্ম-সংশোধন ও চিরশাস্তির জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রেরণা নিয়ে তারা পিছনে তাকাতে নারাজ। ফলে ঈমান ও ইসলাম তাদের আগ্রহের বিষয় নয়। আর এ কারণেই মাজলূমিয়্যাতের দাস্তান প্রচারকারী এ জাতিই আজ ফিলিস্তিনে নৃশংস জালিমের ভূমিকায়! এ এক দীর্ঘ প্রসঙ্গ! এখানে শুধু এটুকু নিবেদন করছি যে, মাজলূমিয়্যাতের ব্যাপক প্রচার ছন্নছাড়া ইহুদি জাতির প্রতি পশ্চিমা-দুনিয়ায় ব্যাপক সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পারমানবিক শক্তি অর্জন এবং পশ্চিমা গণমানসে ব্যাপক সমর্থন সবই সম্ভব হয়েছে।

 

বর্তমান বিশ্বসমাজে সাধারণভাবে সকল মুসলিম, আর বিশেষভাবে আলিম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান চরম বৈরিতার শিকার। আমাদের এই ছোট্ট দেশে, যার ৮০% নাগরিক মুসলমান, আমরা কওমী মাদরাসার আলিম-তালিবে ইলমরাও এক বৈরী পরিবেশে বসবাস করছি। এ বৈরিতা বিভিন্ন মাত্রার। বামপন্থী, সেক্যুলার ও ইসলামবিদ্বেষী শ্রেণীর তরফ থেকে তীব্র মাত্রায়, ইসলাম-বিমুখ ‘সুশীল’ ও ‘শিক্ষিত’দের তরফ থেকে মাঝারি মাত্রায় আর ইসলাম-মুখী শ্রেণীর তরফ থেকেও রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে কিংবা রুচি, চিন্তা ও মতাদর্শগত দূরত্বের কারণে নিম্নমাত্রায় বৈরিতার শিকার।

 

এই সমাজে কওমী আলিম-তালিবে ইলমের প্রকৃত সুহৃদ খুব বেশি নয়। তাদের আনন্দে আনন্দিত হওয়ার, তাদের বেদনায় ব্যথিত হওয়ার মানুষ খুবই কম। একটি জাতির সবচেয়ে নিরীহ ও নীতিবান অংশের প্রতি জাতির সিংহভাগ মানুষের এই বিমুখতা ও নিস্পৃহতা কীভাবে তৈরি হল?

 

এর জন্য আমাদের বিপক্ষ শিবিরের প্রচার-সংস্কৃতি যদি ৮০% দায়ী হয় তবে আমাদের ‘ঘুমন্ত’ অবস্থা কি ২০% দায়ী হয় না?

 

তদ্রূপ ইসলামপ্রিয়তা বা প্রত্যক্ষ মেলামেশার কারণে যারা কওমী আলেম-উলামার প্রতি কিছু ভক্তি ও সহানুভূতি পোষণ করেন তাদেরও অনেক বড় অংশ কি এ সম্প্রদায়ের দ্বীনী ও দুনিয়াবী

 

চিন্তা-চেতনা এবং কওমী শিক্ষা ধারার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-যৌক্তিকতা সম্পর্কে উদাসীন নন? এর দায় যদি বর্তায় প্রধানত আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা ও সমাজ-ব্যবস্থার উপর, তাহলে দ্বিতীয় পর্যায়ে কি বর্তায় না আমাদের একমুখী কর্মধারার উপর?

 

এটা ঠিক যে, এখন মনুষ্যত্বের সংকটকাল। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ‘মাটির মানুষ’ কে পরিণত করেছে ধাতব মানবে। ফলে আশুলিয়ার অগ্নি বা সাভাবের ভবনধস কিছুই এখন তাদের স্পর্শ করে না। সাধারণ মানুষের মাঝে কিছু আলোড়ন হয় বটে, কিন্তু এরপরই আগের মতো সুনসান নীরবতা। তবে শত বঞ্চনার মাঝেও শ্রমিক-সমাজ এদিক থেকে সৌভাগ্যবান যে, দুর্যোগে-দুর্ভোগে তাদের পাশে দাঁড়াতে মানুষ শঙ্কা বোধ করে না। ওপর তলার মানুষও একে ‘মুখ রক্ষার’ জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে। পক্ষান্তরে আলিম-সমাজের পাশে দাঁড়াতে গণ-মানসে বিরাজ করে শঙ্কা ও দ্বিধা! কারণ আলিমরা যে ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসী’! যদিও তাঁরা সমাজ ও সন্ত্রাসের মূলধারা থেকে অনেক অনেক দূরে।

 

এমনই জোর প্রচারের! প্রত্যক্ষ বাস্তবতার চেয়েও এখন অধিক বাস্তব প্রচারিত ‘বাস্তবতা’!

এখানে ভীতি বা হতাশা ব্যক্ত করা নয়, বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য। নিজেদের যারা উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর জন্য তাঁদের আবার কীসের ভয়, কীসের হতাশা? তাঁদের হৃদয়-বীণায় তো স্পন্দিত এই বাণী-‘আমার নামায, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য।’

সুতরাং ভীতি ও হতাশা নয়। এখন প্রয়োজন উদ্যম ও সঠিক কর্মপন্থা। আর এরই জন্য দরকার বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধি।

 

যে সমাজে আমাদের বসবাস, যে সমাজে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কুদরত আমাদের উপর অর্পণ করেছে সেই সমাজের বৈরী শক্তির মোকাবেলা তো আমাদের করতেই হবে। তবে তা করতে হবে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে।

 

শত্রু-শিবিরের বিরামহীন মিথ্যাচার এই মুসলিম-সমাজেও যে প্রতিকূল আবহের সৃষ্টি করেছে তা দূর করে দাওয়াতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তথ্য-শক্তি ও প্রচার-শক্তির কোনো বিকল্প নেই। আর সত্যের আগমন যখন ঘটবে মিথ্যা তখন অপসৃত হবেই। (ইনশাআল্লাহ)

 

তথ্যের শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য এর প্রামাণিকতা সংরক্ষণ জরুরি। প্রামাণিকতা বিহীন তথ্য নিছক ‘দাবি’র পর্যায়ে থাকে। দাবিটি ‘প্রমাণ’ তখনই হয় যখন তার সঙ্গে থাকে সনদ বা সূত্র, নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নাম-ঠিকানা, সাক্ষর-টিপসই, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য-বিবরণ; কোথাও কোথাও ছবি, কথাবার্তার রেকর্ড, ঘটনার আলামত ইত্যাদি। এগুলোর দ্বারা একটি তথ্য প্রামাণিকতার গুণ অর্জন করে। অন্যভাষায় একটি ‘দাবি’ ‘তথ্যে’ পরিণত হয়।

 

এ প্রসঙ্গে একটি উত্তম দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।

 

সবাই জানেন, সাভার-ট্রাজেডিতে উদ্ধার ও সাহায্যে কওমী সাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু যথারীতি মিডিয়ায় তা তেমন করে আসেনি। কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকায় রক্তদান ও উদ্ধার তৎপরতার দু-একটি ছবি ও দু-চার ছত্র লেখা প্রকাশিত হয়েছে বটে, তবে বলাইবাহুল্য, অংশগ্রহণের প্রকৃত চিত্র তাতে উঠে আসেনি। সুতরাং কেবল বর্তমান মিডিয়ার উপর নির্ভর করে আমরা আমাদের ইতিবাচক তৎপরতার যথার্থ ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারব না। ফলে হয়তো নিকট-ভবিষ্যতেও এ সকল তৎপরতা কওমী-আলিমদের ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। আর এ তো সর্বজন স্বীকৃত যে, আমরা অতি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। সুতরাং কিরামান-কাতিবীনের কাছে (ইনশাআল্লাহ) আমাদের আমল সংরক্ষিত থাকলেও জাতির স্মৃতি থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

 

এ ঘটনায় তথ্য-সংরক্ষণের একটি সুন্দর উদাহরণ, মাদরাসাতুল মদীনার তৎপরতা। ঘটনার পরপরই স্বয়ং মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ (আদীব হুজুর) দামাত বারাকাতুহুম এই লেখককে বলেছিলেন, ‘এখন উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহণ জরুরি।’ সাহায্য-তৎরপতা সম্পর্কে তাদের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘প্রথমে তাঁরা বিভিন্ন হাসপাতালে যেয়ে প্রয়োজনগ্রস্ত আহতদের তালিকা প্রস্ত্তত করবেন। যেখানে তাদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর থাকবে। এরপর সেই তালিকা অনুসারে প্রত্যেককে অর্থ-সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সিডরের সময়ও আমরা এভাবে সহায়তা-কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলাম। এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ-সাহায্য পৌঁছে দিয়েছিলাম। ঐ সময়ের তালিকাও সংরক্ষিত আছে।’

 

তো সাভার ও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে এ নিয়মেই তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং প্রত্যেকের নামের সাথে তার টিপসইও সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন আহতদের নাম-ঠিকানা, টিপসই ও মোবাইল নম্বর সম্বলিত একটি প্রামাণিক তথ্য-শিট প্রস্ত্তত হয়েছে অন্যদিকে ভবিষ্যতেও এই দুঃস্থ মানুষগুলোর সাথে যোগাযোগের ও সহায়তা অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকছে। তাছাড়া এই লিখিত ডকুমেন্ট আগামীতে কোনো গবেষণা-কর্মেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারবে।

 

তাঁদের সহায়তা-তহবিলে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার ছাত্র-শিক্ষকগণও সাধ্যমত শামিল হয়েছেন। সাভারের রাজফুলবাড়িয়া মাদরাসার শাইখুল হাদীস মাওলানা আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবরাহীম ছাহেবের তত্ত্বাবধানে উদ্ধার ও সহায়তা পরিচালিত হয়েছে। সাভারে তাদের যে ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছিল তার একজন দায়িত্বশীল মাওলানা শাহেদ (মোবাইল : ০১৮১৫-৪১৩৪৩২) এই লেখককে বলেছেন যে, ‘তারা কয়েক লক্ষ টাকা আহতদের মাঝে বিতরণ করেছেন। খাবার ও অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন।’

 

সমাজের দুর্যোগে-দুর্ভোগে কওমী আলেমগণ তাদের সাধ্য অনুযায়ী সবসময়ই অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু প্রধানত প্রচার-বিমুখতা ও নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতার কারণে তথ্য-সংরক্ষণের গরজ বোধ করা হয়নি। অথচ ইচ্ছা করলে খুব সহজেই তাঁরা তা করতে পারতেন। মাদরাসার বার্ষিক আয়-ব্যয়ের রিপোর্টে বা বছরান্তে মাদরাসা থেকে প্রকাশিত স্মারকে সামাজিক সহায়তার একটা প্রামাণ্য বিবরণ তুলে ধরা কঠিন কিছু ছিল না। টিভি-ক্যামেরার সামনে সহায়তা-বিতরণের এই যুগে আমাদের আলিমদের এই নিরব কার্যক্রম নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এদেশের সুশীল-সমাজ, যারা কওমী মাদরাসার ধারে কাছেও না এসে কওমী মাদরাসা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তারা যদি একটু কাছে আসতেন এবং এই ইতিহাসগুলো শুনতেন তাহলে বুঝতে পারতেন কেন এই ‘হুজুর’দের ডাকে গোটা দেশ জেগে ওঠে। যাই হোক, এখন যেহেতু আমাদের বিপন্নতার আলামতগুলো সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে তাই পূর্বসূরীদের ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের পাশাপাশি সময়ের কিছু দাবি পূরণও বিচক্ষণতার চাহিদা। নিয়ত যদি খালিস থাকে তাহলে মেহেরবান আল্লাহর রহমতের কাছে আশা করা যায়, তিনি আমাদের আখিরাতের বিনিময়ও হ্রাস করবেন না।

 

সাভার-ট্রাজেডির কিছু দিন পরই আরেকটি মর্মান্তিক, নৃশংসতা ও রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে গেল হেফাযতে ইসলামের ৫ মের অবরোধকে কেন্দ্র করে। সারা দিনের হামলা ও গুলি বর্ষণের পর শাপলা চত্বরে সমবেত ঘুমন্ত ও ইবাদতরত মানুষগুলোর উপর চালানো হল এক নির্মম ‘অভিযান’। দেশি-বিদেশি সংবাদ-মাধ্যম ও রাজনৈতিক সূত্র থেকে নিহতের সংখ্যা বলা হয়েছে হাজার হাজার। জানা গেছে, হেফাযতে ইসলামের পক্ষ থেকে আহত, নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ কাজ সমাপ্ত হলে প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে। সরকারের তরফ থেকে গণহত্যার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। সরকারী প্রশাসন একে অবাস্তব প্রচারণা বলে আখ্যায়িত করেছে।

 

হায়! এসব বক্তব্য যদি সত্য হত! নতুবা এই ভূমি এত মুমিনের খুন কীভাবে শোষণ করবে? এই আকাশ এত আহতের আহাজারি কীভাবে ফিরিয়ে দিবে? হায়! আমাদের এই ক্ষুদ্র ভূখন্ড কীভাবে বহন করবে এত এতিম-

 

বিধবার অভিশাপ!

 

এই ঘটনা কওমী ইতিহাসে এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, এতে অনেক আলিম-তালিবে ইলম শহীদ বা আহত হয়েছেন। অন্যরাও তো এসেছিলেন হেফাযতে ইসলামেরই ডাকে। সুতরাং তাঁরাও আমাদের কওমী পরিবারেরই সদস্য।

 

৭১ পরবর্তী কয়েক বছর এদেশের নিরীহ-নিরপরাধ ঈমানদারদের উপরও যে নজিরবিহীন নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা কোনোভাবেই হানাদার বাহিনীর জুলুম-নির্যাতনের চেয়ে কম ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ জাতির, সেই ইতিহাস প্রচারিত হয়নি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করাই তো ইতিহাস-চর্চার অন্যতম প্রধান সুফল।

 

৫ ও ৬ মের ঘটনায় আহত-নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা যা-ই হোক না কেন তাদের তালিকা প্রস্ত্তত করা এ কারণেও জরুরি যে, অন্তত বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোর কর্তব্যটুকু যেন পালন করা যায়।

 

বর্তমান বৈরী সমাজের আচরণ ও মানসিকতায় যদি আমরা পরিবর্তন আনতে চাই, বৈরিতা ও জিঘাংসার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহানুভূতির আবহ যদি সৃষ্টি করতে চাই, এ ভূখন্ডে ঈমানদারদের আগামী প্রজন্মের বসবাস যদি নিরাপদ করতে চাই, সর্বোপরি দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে মগ্ন থেকে জাতিকে সৌভাগ্যের রাজপথ দেখাতে চাই তাহলে আমাদের ‘মজলুমিয়্যাতের

 

দাস্তান’ জাতিকে শোনাতে হবে। আর সীমিত সাধ্যের ভিতরেও মজলুম জনতার পাশে দাঁড়ানোর যে সদিচ্ছা আমরা পোষণ করি সে সম্পর্কেও জাতিকে অবগত করতে হবে।

আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ভাবমর্যাদা উদ্ধারের স্বার্থে, জাতির কল্যাণ ও হেদায়েতের স্বার্থে কওমী আলেমদের তথ্য ও প্রচারের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়া সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।

 

মেহেরবান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

৯-০৫-১৩ ঈ., বৃহস্পতিবার

Leave a comment