ফিক্হ শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সূক্ষ্মদর্শিতা

shutterstock_58382248

ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.) ইসলামের ইতিহাসে সর্বজন পরিচিত একজন জলীলুল কদর তাবেয়ি। উন্নত আমল-আখলাক ও তাক্‌ওয়া-পরহেজগারিতে তিনি এক অনুপম আদর্শ। ইলমে হাদীসে তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত। কুরআন-হাদীস ছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ও কিয়াসে তাঁর পারঙ্গমতা সমকালীন জগতে ছিল বহুলস্বীকৃত| একজন ক্ষণজম্মা ও বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। ফিকহশাস্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে সাহাবায়ে কেরামের পরেই তার উচ্চাসন। সহজাত বিধান ইসলামি আইনের সহজীকরণ ও বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যার তুলনা একমাত্র তিনিই। ফিকহ-ই হানাফীর অনুসারী হিসেবে শরিয়তের বিধি-বিধান পালন করে ধন্য হচ্ছে বিশ্বের তিন চতুর্থাংশ মুসলিম। ফতোয়া প্রদানে তার অসাধারণ প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিচক্ষণতা শুধু তার অনুসারীদেরকেই অনুপ্রাণিত করেনি. সমগ্র বিশ্বের আাইন বিশেষজ্ঞদেরকেও করেছে বিস্ময়ে হতবাক। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বিস্ময়কর মেধা, প্রখর মননশীলতা ও স্বচ্ছ বিশ্লেষণক্ষমতা মুসলিম বিশ্বের সর্বজন মনীষী কর্তৃক একান্ত স্বীকৃত| আল্লামা যাহাবী (রহ.) তাকে বনী আদমের সর্বশ্রেষ্ট মেধাবী ব্যক্তি বলে অবহিত করেছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সমস্যার অভাবিত ও সুষ্ঠু সমাধানে বিবেক হত বিহ্বল হয়ে পড়ে। নিম্নে তারই প্রদত্ত কয়েকটি দৃষ্টান্তোপযোগী ফতোয়া ও ফিক্‌হী সমাধান উপস্থাপিন হল:

 

১. জনৈক স্বামী স্বীয় স্ত্রীর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে শপথ করে বলল যে, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে কথা বলবে না আমিও তোমার সাথে কথা বলব না।’ তৎক্ষনাৎ স্ত্রীও স্বামী অনুরূপ শপথ করে বসল। পরবর্তীতে উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এর নিকট গমন করল এবং ঘটনার বিবরন দিয়ে সঠিক সমাধান চাইল। সুফিয়ান সাওরী বললেন, ‘শপথের কাফফারা দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই।’ স্বামী হতাশ হয়ে কাফফারার বিকল্প এবং সহজ সমাধানের জন্য ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনার পুনঃবিবরণ দিল। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বললেন, তোমরা গিয়ে পরস্পরে আগ্রহভরে কথাবার্তা বল। কাউকে কাফফারা দিতে হবে না। ইমাম সুফিয়ান সাওরী এ ঘটনা শুনে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আপনি মানুষকে অযথা অশুদ্ধ মাসআলা বলেন কেন? ইমাম আবু হানীফা (রহ.) লোকটিকে ডেকে পাঠালেন এবং ঘটনার পূনঃবর্ণনা দিতে বললেন। লোকটির বর্ণনার পর ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-কে সম্বোধন করে বললেন, আমি যা বলেছি ঠিক বলেছি, অশুদ্ধ কিছুই বলেনি। সুফিয়ান সাওরী বললেন, কীভাবে? ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বললেন, স্বামীর শপথের উত্তরে যখন স্ত্রীও অনুরূপ কথা বলল, কথা বলার সূূত্রপাত স্ত্রীর পক্ষ থেকে পাওয়া গেল। সুতরাং শপথের আর কোন কার্যকারীতা বাকী রইল না। সুফিয়ান সাওরী ইমমি আবু হানীফা (রহ.)-এর অভূতপূর্ব সমাধান শুনে বললেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আপনি যা চিন্তা করেন আমরা তা খেয়ালও করি না।’

 

২. কুফার একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি মহা ধুমধামে একসাথে দু’কন্যার বিয়ে দিল। ওয়ালিমা অনুষ্ঠানে স্বামীর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনকে আমন্ত্রণ জানাল। মিছআর ইবনে কুদাম (রহ.), হাসান ইবনে সালেহ (রহ.), সুফিয়ান সাওরী (রহ.) ও ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতো স্বনামধন্য ইমামগণও অনুষ্ঠানে মহামান্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রীতিভোজ চলাকালে অস্বাভাবিক অবস্থায় গৃহকর্তা বের হয়ে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। বাসর রাতে মহিলাদের ভুলের কারণে স্বামী-স্ত্রী রদবদল হয়ে গেছে। যে কন্যা যার সাথে বাসর করছে সে তার স্বামী নয়। অর্থাৎ মেয়ে দু’টি প্রকৃতপক্ষে অপর বোনের স্বামীর সাথেই ভুলক্রমে বাসর করেছে।

 

সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলেন, হযরত মুআবিয়া (রাযি.)-এর সময়ও এমন ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তাতে নিকাহে কোন অসুবিধা হয় না। অবশ্য দু’জনকে মোহর দিতে হবে। মিসআর ইবনে কুদাম (রহ.) ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-কে বললেন, আপনার কী মতামত? ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বললেন, স্বামী আমার কাছে সশরীরে এসে জবানবন্দি দেওয়ার পর আমার মতামত প্রদান করব। স্বামী ডেকে আনা হল। ইমাম সাহেব দু’জনকে আলাদা আলাদা জিজ্ঞেস করলেন যে, যে মহিলা রাতে তোমার সাথে ছিল সে তোমার স্ত্রী হলে তুমি কী রাজি আছ? উভয়ে হ্যাঁ জবাব দিলে ইমাম সাহেব বললেন, যে মহিলার সাথে তোমাদের বিয়ে হয়েছিল তাদেরকে তালাক দিয়ে দাও এবং তোমরা সেই মহিলাকে বিয়ে কর যার সাথে তোমাদের বাসর হয়েছে।

 

সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বললেন, ফিকহের দৃষ্টিতে সন্দেহজনক সহবাস হওয়ার কারণে এটা বিশুদ্ধ। এতে নিকাহও ভেঙে যায় না। কিন্তু ইমাম সাহেব সর্বদা জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েই ফিকহী সমাধান পেশ করেন। তিনি সম্যক অবগত ছিলেন যে, বর্তমান পদ্ধতিতে নিকাহ বহাল থাকা আত্মসম্মানবোধের বিপরীত। কোন বাধ্যবাধকতার কারণে যদিও ওই দম্পতি নিকাহকে মেনেও নেয় তবুও উভয়ের মধ্যে নিষ্ঠা ও আস্থায় কিছুটা হলেও ছন্দপতন ঘটবে। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ নির্জনবাস পাওয়া যায়নি বিধায় মোহর ও অর্ধেক ধার্য হবে।

 

৩. মিসরের প্রসিদ্ধ ইমাম লায়স ইবনে সা’দ (রহ.) বলেন, আমি ইমাম আবু হানীফা (রহ.) (রহ.)-এর কথা প্রায়ই শুনতাম, তবে দেখার সুযোগ হয়নি। হজের প্রাক্কালে মক্কা শরীফের এক বিরাট মজলিশে প্রচুর ভীড় লক্ষ করলাম। জনৈক ব্যক্তি উচ্চাসনে বসে আছে। সবাই তাঁর নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করছে। এক ব্যক্তি বলল, হে ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)! [লোকটির সম্বোধনের কারণেই আমি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-কে চিনতে পারলাম] ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিকট লোকটি প্রশ্ন করল, ‘আমার রূঢ় স্বভাবের এক ছেলে আছে। তাকে বিয়ে করালে সে তালাক দিয়ে দেয়। ক্রীতদাসী ক্রয় করলে আযাদ করে দেয়।’ আপনার কাছে সমস্যাটির সমাধান চাই। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, তুমি তাকে ক্রীতদাসী বেচাকেনার বাজারে নিয়ে যাও এবং তোমার পছন্দনীয় ক্রীতদাসী ক্রয় করে তার সাথে বিয়ে দাও। এখন সে আর আযাদ করতে পারবে না। কারণ ওই ক্রীতদাসীর সে মালিক নয়। তালাক দিলেও তোমার কোন অসুবিধা নেই। তোমার ক্রীতদাসী তোমারই থাকবে। সা’দ বললেন, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উত্তরে আমি যতটুকু অভিভূত হয়নি; তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি তাঁর অসাধারণ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে।

 

৪. খলীফা মনসুরের দরবারে রবি নামক জনৈক ব্যক্তি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সাথে শত্রুতা পোষণ করত। খলীফার আহ্বানে একদিন ইমাম সাহেব মনসুরের দরবারে গেলেন। সেখানে রবিও ছিল। সে খলীফাকে বলল, হুযুর এ লোকটি খলীফার পিতামহের (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস) বিরোধিতা করে। তিনি বললেন, একজন ব্যক্তি কোন বিষয়ে শপথ করার দু-এক দিন পর ইনশাআল্লাহ বললে শপথ বলে গণ্য হবে। এ শপথ পূরণ করা জরুরি হবে। ইমাম সাহেব তার বিপরীত ফতোয়া প্রদান করলেন। ইনশাআল্লাহ শব্দটি শপথের সাথে আসলে শপথের অংশ বলে গণ্য হবে। নতুবা অনর্থক হবে। ইমাম সাহেব বললেন যে, রবির ধারণা হল যে, জ সাধারনের ওপর আপনার বায়আতের কোন প্রভাব নেই। খলীফা বললেন কীভাবে? ইমাম সাহেব বললেন, তার ধারণা হল যে, জনসাধারণ আপনার হাতে খেলাফতের বায়আত গ্রহণ করে এবং শপথ করার পর ঘরে গিয়ে ইনশাআল্লাহ বলে, যাতে শপথের কোন প্রভাব থাকে না। এতে তাদের ওপর শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না। খলীফা এসে রবিকে বললেন, তুমি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-কে চক্রান্তের জালে আবদ্ধ করতে পার না। তার ওপর তোমার চক্রান্ত কার্যকর হবে না। ইমাম সাহেব দরবার থেকে বের হওয়ার পর রবি বলল, আজকে তুমি আমার প্রাণসংহার করে ছিলে? তিনি বললেন, এটাতো তোমার ধারণা। আমি প্রতিরোধ করেছি মাত্র।

 

৫. একবার কিছু খারিজী সম্প্রদয়ের লোক ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ঘরে চড়াও হয়ে বলল, কুফরী থেকে তাওবা কর। ইমাম সাহেব বললেন, হ্যাঁ। আমি কুফরী থেকে তাওবা করলাম। খারিজীদের বিশ্বাস হল, গোনাহ করলে মানুষ কাফির হয়ে যায়। অর্থাৎ গোনাহ ও কুফর এক জিনিস। ইমাম সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল যে জিনিস কে তোমরা কুফরী মনে কর আমি তা থেকে তাওবা করলাম। কিন্তু কিছু লোক খারিজীদের নিকট গিয়ে বলল যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তোমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। তার উদ্দেশ্য ছিল আরেকটি। খারিজীরা ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-কে বলল, তুমি আমাদের সাথে প্রতারণা করলে কেন? ইমাম সাহেব বললেন, তোমরা পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে আমার প্রতি এ ধারণা করেছ নাকি ধারণাপ্রসূত? তারা উত্তরে বলল, ধারণাপ্রসূত। ইমাম সাহেব বললেন, তবে তোমাদের নিজেদের তাওবা করা উচিত। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন, কিছু কিছু ধারণা পাপের অন্তর্ভুক্ত।

 

৬. একদিন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। শাগরিদরা উপস্থিত ছিলেন। অকস্মাৎ খারিজীরা ঢুকে পড়ল। লোকজন পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ইমাম সাহেব স্বান্ত্বনাপূর্বক বললেন, তোমরা ভয় করো না। শান্তিতে বস। খারিজীদের সর্দার ইমাম সাহেবকে বললেন, তোমরা কারা? ইমাম সাহেব বললেন, আমরা আশ্রয়প্রার্থী। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, মুশরিকদের কেউ যদি আপনার কাছে আশ্রয় চায় তবে তাকে আশ্রয় দাও। যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়। অতপর তাকে তার আশ্রয়স্থল পর্যন্ত পৌঁছে দাও। খারিজীরা তাদের ব্যতিরেকে মুসলমানদের সকল সম্প্রদায়কে কাফির মনে করে এবং হত্যা ওয়াজিব মনে করে। যাতে ইমাম আবু হানীফা তার আকীদা বর্ণনা করার পর তাকে কাফির সাব্যস্থ করে হত্যা করবে। কিন্তু ইমাম সাহেবের উত্তরে তারা হতবাক হয়ে গেল। সুতরাং তাদের সর্দার সাথীদের বলল, তাকে কোরান পাঠ করে শোনাও এবং তার গৃহে পৌঁছে দাও।

 

৭. আবুল আব্বাস মনসুরের দরবারে একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিল। সে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সাথে শত্রুতা পোষন করত। সর্বদা ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ক্ষতিসাধন করার চিন্তা করত। একদিন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কোন প্রয়োজনে খলীফার দরবারে উপস্থিত হলেন। ঘটনাক্রমে আবুল আব্বাস তখন দরবারে উপস্থিত ছিলেন। সে বলতে লাগল ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আজ আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। সে ইমাম সাহেবকে সম্বোধন করে বলল, খলীফা আমাদেরকে অনেক সময় এমন ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন অথচ লোকটি অদৌ অপরাধী কিনা আমরা জানি না। এ অবস্থায় আমরা কি খলীফার আদেশ পালন করব? ইমাম সাহেব তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, তোমাদের মতে খলীফার আদেশ সত্য মনে হয় নাকি মিথ্যা? খলীফার দরবারে তারই সামনে তার আদেশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাহস কার থাকতে পারে? আবুল আব্বাস বাধ্য হয়ে বললেন, সত্য! ইমাম সাহেব বললেন, সত্য আদেশ পালনে প্রশ্ন করার কী আছে?

 

৮. জনৈক ব্যক্তি শপথ করে বলল যে, ‘আজ আমি জানাবতের গোসল করলে আমার স্ত্রীগণ তালাক। কিছুক্ষণ পরে বলল, আজ আমি নামায কাযা করলে আমার স্ত্রীগণ তালাক। অতঃপর বলল, আমি আজ স্ত্রীর সাথে সহবাস না করলে সে তালাক।’ ইমাম সাহেব এর নিকট মাসআলার সমাধান চাইলে তিনি বলেন, আসরের নামায পড়ে স্ত্রীর সাথে সহবাস কর এবং সুর্যাস্থের পরে গোসল করে তাড়াতাড়ি নামজ পড়ে নাও। এমতাবস্থায় সকল শর্ত পূরণ হয়ে যাবে। স্ত্রীর সাথে সহবাসও হল নামাযও কাযা হল না। জানাবতের গোসল সে সময়ে হল যখন দিন চলে গেল।

 

৯. জনৈক ব্যক্তি একদিন ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিকট এসে বলল, আমি এক জায়গায় কিছু টাকা রেখেছিলাম। এখন জায়গাটি আমার স্মরণ থেকে উধাও হয়ে গেছে। আমাকে একটি তদবীর বলে দিন। টাকা আমার বেশ প্রয়োজন। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি আজ সারা রাত নামায পড়তে থাক। লোকটি নামায পড়া আরম্ভ করে দিল। ঘটনাক্রমে কিছুক্ষন পর তার টাকা রাখার জায়গা মনে পড়ে গেল। লোকটি দৌড়াতে দৌড়াতে ইমাম সাহেবের নিকট আসল এবং বলল, আপনার তদবীর কার্যকর হয়েছে। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি সারা রাত নামায পড়বে এটা শয়তান কতটুকু সহ্য করতে পারে? এ জন্য সে তোমাকে তাড়াতাড়ি স্মরণ করিয়ে দিল। আপনার উচিত ছিল কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সারা রাত নামায আদায় করতে থাকা।

 

১০. এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট দৌড়ে এসে বলল, ঘরের কোণে আমি কোন জিনিস লুকিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু এখন ভ্রম হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব বললেন, তোমার স্মরণ না থাকলে আমার স্মরণ থাকার কথা নয়। এতে লোকটি কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিল। ইমাম সাহেব তার নিকট সদয় হলেন এবং কিছু শাগরিদ নিয়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। শাগরিদদের বললেন, এটা যদি তোমাদের ঘর হত তবে কোন জিনিস হেফাযতের জন্য তোমরা কোথায় গোপন রাখতে? প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেকনুযায়ী বিভিন্ন স্থানের কথা বললেন। সেই চারটি স্থানের কোথাও নিশ্চয় সংরক্ষিত থাকবে। ইমাম সাহেব সকল স্থান খনন করার নির্দেশ দিলেন। তৃতীয় স্থান খনন করতেই হারানো বস্তু পাওয়া গেল।

 

ইমাম সাহেবের মহল্লায় একজন আটাপেষক থাকত। সে ছিল গোঁড়াপন্থী শিয়া সম্প্রদয়ের অন্তর্ভুক্ত। তার কাছে দুটি খচ্চর ছিল। একটির নাম রাখল আবু বকর। দ্বিতীয়টির নাম রাখল ওমর। ঘটনাক্রমে এক খচ্চরের লাথিতে লোকটির মাথা ফেটে গেল। এবং এ আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হল। ঘটনাটি ইমাম সাহেবের নিকট পৌঁছলে ইমাম সাহেব বললেন, লোকটি হয়তো সেই খচ্চরের আঘাতে মৃত্যু বরণ করেছে যার নাম ছিল ওমর। বাস্তবে তাই ঘটেছিল।

 

১১. কুফায় একজন কট্টরপন্থি শিয়া ছিল। সে হযরত ওমর (রাযি.)-কে ইহুদি বলত। একদিন ইমাম সাহেব তার নিকট গিয়ে কললেন, তোমার কন্যার জন্য একজন সুপাত্র পাওয়া গেছে। সে ভদ্র এবং ধনী। তা ছাড়া পরহেযগারও, রাত্রী জাগরণকারী এবং হাফেযে কুরআন। লোকটি বলল এর চেয়ে ভালো পাত্র আর কে হতে পারে। আপনি বিয়ের কাজ শুরু করে দিন। ইমাম সাহেব বললেন, কিন্তু লোকটি ইহুদি। লোকটি বলল, আপনি একজন ইহুদির সাথে আত্মীয়তা করতে বলছেন? ইমাম সাহেব বললেন, আল্লাহ রাসূল একজন ইহুদির সাথে (আপনার ধারনা মতে) আত্মীয়তা করতে পারলে আপনার অসুবিধা কোথায়? আল্লাহর কী অপার মহিমা! এতটুকু কথায় সে বুঝতে পারল এবং নিজ ভ্রান্ত আকীদা পরিত্যাগ করল।

 

তথ্য নির্দেশিকা :

১. উকুদুল মারজান: ইমাম তাহাওয়ী (রহ.)

২. মানাকিবুল নুমান: শায়খ আবু আবদুল্লাহ আস-সামীরী

৩. শাফায়িকুন নু’মান: আল্লামা যামাখশারী

৪. কাশাফুল আসরার: ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে হারিসী

৫. মানাকিবে আবু হানীফা: আল্লামা যাহাবী (রহ.)

৬. খয়রাতুল হিসান: ইবনে হাজার মককী

৭. সীরাতুন নু’মান: আল্লামা শিবলী নুমানী

 

Leave a comment