ইন্টারনেটে ইসলাম প্রচারের পথ, পন্থা ও বিস্তারিত

shutterstock_58382248

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মুহূর্তেই চিঠি আদান প্রদান, ভিডিও কনফারেন্সসহ কত কী! বাংলা ইংরেজি আরবিসহ বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের তাফসির পড়া যাচ্ছে। দুর্লভ যেসব কিতাব সংগ্রহ করা আনেক কষ্টসাধ্য সেসব কিতাব এখন মাউসের এক ক্লিকেই এসে যাচ্ছে। হাজার হাজার কিতাবের মাকতাবাতুশ শামেলা একটি ছোট্ট মেমোরিতেই রাখা যাচ্ছে। এসবই সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের চরম উন্নতির ফলে। বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ও সর্বাধিক ক্রিয়াশীল বিস্ময়কর আবিস্কার হচ্ছে ইন্টারনেট।

 

বর্তমানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন অনুসঙ্গ হয়ে এসেছে ইন্টারনেট। ঘরে ঘরে কম্পিওটার ঠাঁই করে নিয়েছে। তারই ওপর ভিত্তি করে যোগাযোগের নতুন এই মাধ্যম সব জায়গায় ঢুকে পড়েছে। প্রথমে কম্পিউটার ভিত্তিক থাকলেও তার বিবর্তন ঘটেছে দ্রুত। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও আজ ইন্টারনেটের বিশাল জগতে ঢোকা যাচ্ছে। ব্লগিং, গুগলিং, টুইটারিং, ফেসবুকিং, চ্যাটিং, আপ্লোডিং, ডাউনলোডিং, ইউটিউব, ইমেইল, উইকিপিডিয়া এসবই এখন মানুষের একান্ত পরিচিত হয়ে উঠেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকা গুলোর নেট সংস্করণে ঢুকে দেখছেন সেখানে নতুন কোনো খবর আছে কিনা। জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্যাটেলাইট, এফ এম রেডিও, অনলাইন গণমাধ্যম।

 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় গণযোগাযোগের এই জনপ্রিয় মাধ্যমটিতে উপেক্ষিত থেকেছে ইসলাম। যেখানে ইসলাম বিরোধীরা আজস্র ব্লগ ও পেজ খুলে প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে সেখানে ইসলমের সৌন্দর্য্য তুলে ধরাতো দূরের কথা ইসলামপন্থিদের অলস ঘুমের কারণে বিরোধীদের মিথ্যাচারের যাথাযথ জবাব পর্যন্ত দেয়া যাচ্ছেনা। ফলে মানুষের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। মনের অজান্তেই অনেকে ইসলামবিরোধীদের মিত্রে পরিণত হয়ে নাস্তিকের তালিকায় নাম লিখাচ্ছে। প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন রাজীব হায়দার।

 

বিরোধীদের মিথ্যা অভিযোগের সঠিক জবাব দেওয়ার মতো সমৃদ্ধ লেখকবৃন্দ ইন্টারনেটে অনুপস্থিত। নবীনদের মধ্যে যারা বিরোধীদের জবাব দেয়ার চেষ্টা করছেন তাদের মধ্যেও আনেকে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানে অপরিপক্ব হওয়ায় তাদের প্রদত্ত জবাব সর্ব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।

 

আলেম সমাজের একটি বিশাল অংশ বরাবরই নিজেদেরকে আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতেই যেন স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। তাদের বিরুদ্ধে কতটা মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে এর খবরও তাদের নেই। যখন ইয়াহুদীরা ইনুসেন্স অব মুসলিম রচনা করে বিশ্বনবীর সাথে চরম বেআদবি করল; তখন আমরা শুধু মিছিল মিটিংয়ের মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করারকেই আমাদের একমাত্র দায়িত্ব মনে করেছি। এর জবাবে আরেকটি চলচ্ছিত্র নির্মাণ করা তো দূরের কথা, এর প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনুভব করিনি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্ছিত্র গেরিলা নির্মাণ করে প্রমাণ করা হয়েছে রাজাকার মানেই দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক(?)। মাওলানারাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা, গণধর্ষণ ও লুণ্ঠনের মূল হোতা। আমরা কি জানি কিভাবে আমাদেকে স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই গেরিলায়? এই বিতর্কিত চলচ্ছিত্রটি বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছে। ঘেটুপুত্র কমলা্থর মাধ্যমে উস্কে দেয়া হয়েছে সমকামিতাকে।

 

ওলামায়ে কেরামের এই মিডিয়া বিমুখতাকে যুগের চ্যালেঞ্জ মুকাবিলায় অবচেতন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মূল্যবান সম্পদের পাহারাদারের সাথে তুলনা করা যায়। তারা ইসলামের পাহারাদার, কিন্তু ঘুমিয়ে পাহারা দিচ্ছেন।

 

গত ২২ মার্চ ২০১৩ দৈনিক কালের কন্ঠে ‘আল্লামা আনওয়ার শাহর পরামর্শ’ শিরোনামে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)-এর ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের অন্যতম দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের মহাপরিচালক আল্লামা আযহার আলী আনওয়ার শাহ (দা. বা.)-এর একটি বক্তব্য ছাপা হয়; এতে তিনি বলেন ‘আমরা আলেম সমাজ সাধারণত সরলপ্রাণ। ব্লগ, ইন্টারনেট, আধুনিক নানা গণমাধ্যমের সঙ্গে তেমন পরিচিত নই। প্রয়োজনীয় যোগাযোগও রক্ষা করি না। ওই সব মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদেও বিরুদ্ধে কখন কী হয়-না হয় তাও সব সময় জানা সম্ভব হয় না।’

 

সরলপ্রাণ ওলামায়ে কেরামের এই মিডিয়া বিমুখতাকে অপূর্ব সুযোগ হিসেবে নিয়েছে ইসলাম বিরোধী চক্র। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই লিখে যাচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে ঘটিয়ে দিচ্ছে অঘোষিত ইন্টারনেট বিপ্লব। ইউটিউবে হাজার হাজার বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে মুসলমানদের বিরোদ্ধে। ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ করছে নীরবে। এমনকি মানবতার পরম বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মহান চরিত্রও রেহাই পাচ্ছে না তাদের আক্রমণ থেকে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে সন্ত্রাসী আছে শুধু তা প্রমাণ করলেই হবে না বরং মুসলমানদের প্রত্যেকটি ইউনিট অর্থাৎ প্রত্যেকটি মুসলমানই আজন্ম সন্ত্রাসী প্রত্যেকটি মুসলমানের রক্তেই রয়েছে সন্ত্রাসের বীজ তা প্রমাণ করাকেই আজ তারা প্রধান কর্তব্য এবং বৈধ মনে করছে। কারণ, তা করা গেলেই মুসলমানদের উপর আক্রমণ বৈধ হবে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা হলো রয়টার্স। পৃথিবীর এমন কোনো সংবাদ পত্র, রেডিও সেন্টার, টিভি সেন্টার নেই যারা রয়টার থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে না। বর্তমান বিশ্বের প্রধান দুটি প্রচার মাধ্যম বিবিসি এবং ভয়েস অব অ্যামেরিকাও প্রায় নব্বই ভাগ সংবাদ রয়টার থেকে সংগ্রহ করে থাকে। বিখ্যাত এই সংবাদ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস রয়টার্স ১৮১৬ সালে জার্মনীর এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

 

রয়টারের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তাদেরই। টাইম, নিউজ উইকের মতো বহুলপ্রচলিত পত্রিকাগুলোর প্রভাবশালী সাংবাদিক ও কলামিস্ট তারাই। নতুন প্রজন্মের একটি বিশাল আংশ, যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতেও আমরা ব্যার্থ হয়েছি তাদেরকে ইতোমধ্যেই তারা কাবু করে ফেলেছে। শুধু তাই নয় ইসলামের কথা বলে কিছু কিছু সুযোগ সন্ধানী কাদিয়ানী, দেওয়ানবাগির মতো বিপথগামী গোষ্ঠিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ধর্মভীরু মুসলমানদের মগজ ধুলাইয়ে ব্যস্ত। আমরা যারা ইন্টারনেট থেকে দূরে, তারা মনে করি বাংলাদেশ কয়জনই বা ইন্টারনেট ব্যাবহার করেন। আমাদের এ অমূলক ধারণা ভেঙে দিতে একটি তথ্যই যথেষ্ট যে, দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রিন্ট ভার্সনের চেয়ে ইন্টারনেট ভার্সনের পাঠক প্রায় দ্বিগুণ। শীর্ষ প্রথম আলো, ইত্তেফাক, আমার দেশ থেকে নিয়ে আমাদের সময় পর্যন্ত সবগুলো পত্রিকার নেট ভার্সনের পাঠক দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ দৈনিক আমার দেশের ইন্টারনেটে পাঠক সংখ্যা ৮৮,০২,৫৮৪ জন।

 

বলা যায় ইন্টারনেট দীনী দাওয়াতের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। অনেক ফ্যামিলি আছে যারা আধুনিকতার নামে তাদের সন্তানদেরকে ইসলামকে জানার সুযোগ দেয়নি; আল্লাহ, রাসুল (সা.) পরকাল সম্পর্কে দেয়নি কোনো ধারণা। তারা দ্বীনের দাওয়াত থেকেও মাহরূম হয়েছে। এই প্রজন্মের অধিকাংশই এমন যে সারা দিন ইন্টারনেটেই পড়ে থাকে। সেই প্রজন্মের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদেরকে দীনের দাওয়াত দেওয়ার অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে ইন্টারনেটই সবচেয়ে সহজ।

 

আর্বানাইজেশনের এই যুগে তৈরি হচ্ছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। একেকটি অট্টালিকার একেকটি তলায় বাস করছে তিন চারটি ফ্যামিলি। লোকসংখ্যার বিচারে এ রকম একটি অট্টালিকাই যেন একটি গ্রাম। নিরাপত্তার কারণে সে সকল ফ্ল্যাটে প্রবেশ সম্পূর্ণই দুরূহ। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যার অর্থ হাজার হাজার গ্রামে আমরা দাওয়াত নিয়ে যেতে পারছি না। তাহলে কি তারা দীনের দাওয়াত থেকে মাহরূম হবে? তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর সহজ একটি মাধ্যমই ইন্টারনেট।

 

সিংহভাগ উলামায়ে কেরামের ধারণা হলো, ইন্টারনেটে আশ্লীলতার চর্চা হয় তাই আমাদের এর থেকে দূরে থাকাই ভালো। কিন্তু ইন্টারনেট একটি নিরীহ মাধ্যম মাত্র। ইউজার (ব্যাবহারকারী) তাকে যেভাবে ব্যাবহার করবে সে নির্দ্বিধায় সেভাবে ব্যাবহৃত হতে বাধ্য। এ বিবেচনায় ইন্টারনেটকে নিরপেক্ষ বললেও খুব বেশি বলা হবেনা বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হলো আমরা কেন অসুন্দরের প্রচারের আগেই সুন্দরের প্রচার করিনি? ওলামায়ে কেরাম জেগে উঠবেন, কিন্তু তারা জেগে হয়তো দেখবেন আমাদের পূর্বসূরি আওলিয়ায়ে কেরামের ঘামঝরা মেহনতের ফলে সৃষ্ট দীনী পরিবেশ শত্রুর মিথ্য প্রচারের ফলে আনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

 

বাতিল যেভাবে আসে তার প্রতিরোধের চেষ্টাও হতে হবে সে পথেই। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ড. মাহাথির মুহাম্মদ বলেছেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের মোকাবিলা করতে পারি ইন্টারনেটের সাহায্যে। কম্পিওটারের মোকাবিলায় কম্পিওটার এবং কলমের মোকাবিলা করতে পারি কলমের সাহায্যে। আমারা উটের পিঠে চড়ে ল্যান্ডক্রুজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারি না।’ তাই ইসলাম প্রিয় সচেতন সমাজের কাছে বিশেষত আলেম সমাজের প্রতি বিনীত অনুরোধ, এই অপ্রতিরোধ্য ইন্টারনেট আগ্রাসনের যুগে আপনারা একে আর এড়িয়ে চলবেন না। মন্দের সর্বপ্লাবী বিস্তারের আগেই এগিয়ে আসুন সুন্দরের বিস্তারে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামের ব্যাপারে মানুষের কৌতূহল বাড়ছে। ইসলামকে জানতে ও বুঝতে সবাই উদগ্রীব। বিশেষত দেশে দেশে অমুসলিম যুব শ্রেণি আগ্রহী হচ্ছে ইসলামের অমীয় সৌন্দর্যের প্রতি। ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী হচ্ছে ফরাসি সঙ্গীত শিল্পী দিয়ামসের মতো হাজরো তরুণ-তরুণী। এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যাক্তিগত প্রয়াস যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন সামষ্টিক উদ্যোগ। আগামি দিনে আপনাদের সক্রিয়তা নবীনদেরকে আরও উৎসাহী করে তুলবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Leave a comment