যা লিখব শুদ্ধ লিখব

shutterstock_58382248

এখন আমাদের ছোট ছোট তালিবুল ইলমের মাঝে বেশ একটি ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়েছে। লেখার জন্য ব্যাকুলতা। অগ্রজদের কাছে তারা জানতে চান, লেখালেখির ময়দানে কীভাবে তারা প্রবেশ করবেন। তাদের এ আগ্রহ, বেড়ে ওঠার এ আকুতি অতি আনন্দের। তাঁদের ছোট্ট হৃদয়ের পবিত্র অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু কথা লিখতে বসেছি।

 

প্রথমেই আরজ করতে চাই যে, আমাদের দ্বীনের এক অসাধারণ বেশিষ্ট্য সহজতা। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য এবং উম্মতের জন্য সহজতাই পছন্দ করতেন। তাই সকল বিষয়ে আমরা খুঁজব সহজ ও স্বাভাবিক উপায়। কোনো কিছু শেখার স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে ঐ বিষয়ের প্রাথমিক অংশগুলো প্রথমে শেখা এবং তুলনামূলক বেশি প্রয়োজনীয় অংশগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে শেখা।

 

তাহলে লেখালেখিতে সবার আগে কোন বিষয়টি লক্ষণীয়? সবার আগে লক্ষ করতে হয় বানানের বিশুদ্ধতার দিকে। একটি লেখা হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়ে বানানের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা। বানানে ভুল থাকলে সে লেখায় পাঠকের শ্রদ্ধা থাকে না। লেখকের প্রতিও শ্রদ্ধা কমে যায়। লেখার তথ্য, আহবান ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য তা পুনরুদ্ধারে পুরোপুরি সক্ষম হয় না।

 

আমাদের লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য যেহেতু ‘দাওয়াত ইলাল্লাহ’ তাই লেখার প্রতি পাঠক শ্রদ্ধা হারালে আমাদের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। উপায়-উপকরণের এ জগতে দাঈর প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা দাওয়াতের ফলপ্রসূতার জন্য অতি জরুরি।

 

বলতে বা শুনতে খুব সামান্য মনে হলেও বানানের বিশুদ্ধতা সামান্য বিষয় নয়। পারিবারিক সূত্রে বা কোনো মুশফিক উস্তাযের পরিচর্যার কারণে যারা মোটামুটি শুদ্ধ বানানে লিখতে পারেন তাদের কর্তব্য আল্লাহর দরবারে শোকরগোযারি করা। এটি আল্লাহ তাআলার অনেক বড় দান, যা আমরা বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা আমাদের উস্তায ও মুরবিবর শাফকাতপূর্ণ তরবিয়ত দ্বারা লাভ করেছি।

 

বিষয়টির গুরুত্ব অন্যভাবেও চিন্তা করা যায়। কল্পনা করুন, আমাদের কওমী মদরাসার সবাই শুদ্ধ বানানে বাংলা লিখছেন, কারো লেখায় কোনো বানানভুল নেই, শত শত, হাজার হাজার পাঠকের হাতে লেখাগুলো যাচ্ছে, কেউ লক্ষ করছেন, কেউ করছেন না, কিন্তু বানানভুলের অভিযোগ কেউ তুলতে পারছেন না, ভাবুন তো কেমন গৌরবের বিষয় হবে!

 

চারপাশের কিছু অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জাগতিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোও এ দাবি করতে পারবে না যে, তাদের কাছে শিক্ষা সমাপনকারীগণ সবাই শুদ্ধ বানানে বাংলা লেখেন। বড় বড় ডিগ্রিধারী ব্যক্তিও বাংলা লেখায় বানানভুল করেন। যদিও তাঁদের অনেকেই হয়তো ইংরেজী লেখেন শুদ্ধ বানানে। সুতরাং আমরা প্রত্যেকে যদি সংকল্প করি যে, আমার লেখাকে বানানের ভুল থেকে মুক্ত করব তাহলে মাদরাসায় পড়েও আমরা এ বিষয়ে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের চেয়ে এগিয়ে যাব।

 

ইলমুশ শরীয়া তথা কুরআন-সুন্নাহর ইলম তো আমাদের নিজস্ব বিষয়। এখানে তো প্রতিযোগিতার কিছু নেই। আর এ বিষয়ে ‘তাফাককুহ’ ও ব্যুৎপত্তি তো আমাদের অর্জন করতেই হবে। কারণ এটিই আমাদের সাধনা ও পরিশ্রমের মূল অঙ্গন। এই মূল মাকসাদের সহায়ক ও পরিপূরক হিসেবে এবং দাওয়াতের অঙ্গনে সাফল্যের জন্য কিছু সাধারণ বিষয়েও আমাদের অর্জন করতে হবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শ্রেষ্ঠত্ব। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শব্দটি ব্যবহারের কারণ হচ্ছে মা‘নবী শ্রেষ্ঠত্ব সাধারণ মানুষ অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারে না। পারে না বলেই তো কওমী মাদরাসা, উলামা-মাশাইখ ও দ্বীনদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে ইসলাম-বিরোধী চক্র অপপ্রচার করতে পারে এবং কিছু মানুষকে বিভ্রান্তও করতে পারে। বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ যদিও ঐসব প্রচারণাকে সত্য মনে করেন না, কিন্তু অবিরাম মিথ্যাচারে তাদেরও অনেকে অবচেতনে আক্রান্ত হন। তো সেই ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রগুলো কী?

 

বন্ধুগণ! এমন ক্ষেত্র মোটেই কম নয়, অনেক। আর সেসব ক্ষেত্রের অনেকগুলোই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের শিক্ষার অংশ। আর অনেকগুলোই এমন যা অর্জন করা খুব কঠিন কিছু নয়। এ লেখায় আমি শুধু একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আর তা হচ্ছে শুদ্ধ বানানে বাংলা লেখা। এর সাথে এখন যোগ করব, বিশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলা। আমরা সবাই যদি শুদ্ধ লিখি ও শুদ্ধ বলি আর একে পরিণত করি আমাদের তালিবুল ইলম সমাজের শি‘আর ও নিদর্শনে তাহলে এ হবে এক সৌন্দর্য-তীলক, যা আমাদের দান করবে এক ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিশেষত্ব। বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে ইসলামী দাওয়াতের জন্য যা অতি প্রয়োজন।

 

এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে আমরা বানান শুদ্ধ করার মেহনত করব। এর একটি সহজ উপায় আছে, যার দ্বারা অল্প সময়ে আমাদের লেখা বানানভুল-মুক্ত হতে পারে। উপায়টি হচ্ছে শ্রুত-লিখন।

 

অন্তত দু’জন সাথী একটি বানানভুলহীন বই নির্বাচন করব। ঐ বই থেকে একজন পড়ব, অন্যজন শুনে শুনে লিখব। এক প্যারা, দুই প্যারা, আধা পৃষ্ঠা, এক পৃষ্ঠা, সময়-সুযোগ হিসেবে যখন যতটুকু সম্ভব। এরপর দ্বিতীয়জন আরেক জায়গা থেকে পড়ব, আর প্রথমজন লিখব। এবার প্রত্যেকে নিজ নিজ লেখা ঐ বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখি, যদি কোনো বানানে ভুল না থাকে তাহলে আলহামদু লিল্লাহ। ভুল থাকলে শুদ্ধ বানানটি কয়েকবার লিখে ভালোভাবে যেহেনে বসিয়ে নেই যাতে ভবিষ্যতে এ বানানটি আর ভুল না হয়।

 

এ পদ্ধতি দরসেও প্রয়োগ করা যায় এবং এর দ্বারা উর্দূ ফার্সী আরবী সব ভাষার বানানই শুদ্ধ করা যায়। দরসে না হলেও অসুবিধা নেই। আসরের পর দু’জন তিনজন একত্র হয়ে নিজেরাই বানানভুল দূর করার মেহনত করতে পারি। এরপর মাঝে মাঝে যদি কোনো মুশফিক উস্তাযকে কিছু কিছু লেখা দেখাতে পারি তাহলে তো নূরুন আলা নূর।

 

পাঠক যদি বিরক্ত না হন তাহলে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আপনার সাথে ভাগাভাগি করি। আমরা আমাদের ‘ঘরের তালিবুল ইলমদের’ উপর যারা বাংলা ও উর্দু ভাষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করছে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করছি এবং আলহামদুলিল্লাহ বেশ সুফল পাচ্ছি। ওদের একজন বাংলা ভাষার প্রাথমিক পাঠ হিসেবে আদীব হুযুর (হযরত মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দামাত বারাকাতুহুম)-এর আকীদা সিরিজ ও সিরাত সিরিজ পড়েছে। এখন এই বইগুলোর কোনো একটি থেকে উস্তায একটু একটু পড়েন আর তালিবুল ইলম শুনে শুনে লেখে। এরপর তার লেখা দেখা হয়। মাশাআল্লাহ সহজ শব্দগুলোতে বানানভুল হয় না। কখনো হলে তা খাতায় লিখে দেওয়া হয়। তালিবুল ইলম বারবার লিখে তা শুদ্ধ করে।

 

‘এসো উর্দূ শিখি’র তালিবে ইলমকেও এভাবে শ্রুতলিখন করানো হয়। যে পৃষ্ঠাটি পড়ানো হল সে পৃষ্ঠার পড়া শোনার পর দ্বিতীয় কাজ হিসেবে উস্তায ধীরে ধীরে তা পড়েন আর তালিবুল ইলম শুনে শুনে লেখে। কোনো বানানভুল হলে উস্তায শুদ্ধ বানানটি খাতায় লিখে দেন। তালিবুল ইলম নীচে কয়েকবার করে তা লেখে। ছোটবেলায় আমাদের উস্তাযগণ যেভাবে আমাদের হাতের লেখা শেখাতেন ঠিক সেভাবে। তাঁরা খাতায় প্রথম লাইনে একটি বাক্য সুন্দর করে লিখে দিতেন আমরা পরের লাইনগুলোতে বারবার ঐ বাক্যটি লিখতাম এবং উস্তাযে মুহতারামের

 

হস্তাক্ষর অনুকরণের চেষ্টা করতাম। এ নিয়ম অনুসরণ করেই বানান শুদ্ধ করার মেহনত জারি রয়েছে। এতে বানানশুদ্ধ করা ও হাতের লেখা সুন্দর করা দুটো কাজই একসাথে হচ্ছে।

 

একজন ছোট্ট তালিবুল ইলমকে যখন দেখি একটি নতুন বিদেশী ভাষা শুদ্ধ বানানে লিখছে তখন যে আনন্দ হয় তার তুলনা নেই।

 

যে সকল উদ্যমী পিতা তাঁদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন তাঁরা সত্যিই ঈর্ষার পাত্র আর তাঁদের সন্তানেরাও অতি খোশনসীব। কিন্তু আমাদের মতো দুর্বল ও উদ্যমহীন মানুষের তো সন্তানের কিছু হক আদায়ের জন্য কিছু সহজ ও সংক্ষিপ্ত নিয়ম উদ্ভাবন ছাড়া উপায় নেই।

 

শুদ্ধ লেখার প্রসঙ্গে শুদ্ধ বলার বিষয়টিও এসেছিল। এ নিয়ে অন্য কোনো লেখায় কিছু নিবেদন করার ইচ্ছা রইল।

 

Leave a comment